সিলেট আজ মুক্ত দিবস-
- আপডেট সময় : ০৬:১৮:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৮১ বার পড়া হয়েছে
ভিউ নিউজ ৭১ ডেস্ক :
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১৫ ডিসেম্বর সিলেটবাসীর জন্য এক অবিস্মরণীয় ও ঐতিহাসিক দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করেন সিলেটের মানুষ। সন্ধ্যার আগেই বীরের বেশে মুক্তিযোদ্ধারা সিলেট শহরে প্রবেশ করতে শুরু করেন, আর শহর ছেড়ে পালাতে থাকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা।
১৫ ডিসেম্বর সকালের সিলেট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক শহর। অন্যরকম আনন্দ আর উত্তেজনায় মুখর হয়ে ওঠে নগরজুড়ে পরিবেশ। রাজপথে রাজপথে ওঠে স্বাধীনতার শ্লোগান, প্রকম্পিত হয় পুরো নগরী। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব বয়সী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল এক মোহনায় মিলিত হয়। সব কণ্ঠে এক সুর- স্বাধীনতার উল্লাস।
স্বাধীনতা অর্জনে সারা দেশের মতো সিলেটের সর্বস্তরের মানুষ ছিল ঐক্যবদ্ধ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম আগ্রাসনের মুখে হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি সিলেটের মুক্তিকামী মানুষ। সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন তারা। যুদ্ধের সময় সিলেটের বহু এলাকা জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। আগুনের লেলিহান শিখায় ক্ষতবিক্ষত হয় শহর। বোমার আঘাতে ভেঙে পড়ে ঐতিহাসিক আলী আমজাদের ঘড়ি, দ্বিখণ্ডিত হয় কিন ব্রিজসহ বহু স্থাপনা।
ভারত ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর সিলেট শহরে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। এই হামলা ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। ১৩ ডিসেম্বর দুপুরে মুক্তিবাহিনীর একটি দল খাদিমনগর এলাকায় অবস্থান নেয়। একই দিনে দক্ষিণ জালালপুর ও পশ্চিম লামাকাজিতেও মুক্তিযোদ্ধাদের আরও কয়েকটি দল পৌঁছে যায়। উত্তরে পাহাড় ও বনাঞ্চল থাকায় হানাদারদের পালাবার কোনো পথ ছিল না।
এ অবস্থায় খাদিমনগর থেকে দুই সাহসী মুক্তিযোদ্ধা ফোরকান আলী (কুটু মিয়া) ও আনোয়ার হোসেন গোরা একটি গাড়িতে মাইকিং করে পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানাতে শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়ান। তাদের কণ্ঠে নতুন করে সাহস পায় মুক্তিযোদ্ধারা। মাইকিং শুনে আতঙ্কিত মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে আসে, শ্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ।
এই সময় একই পথে শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের উত্তর অঞ্চলের বেসামরিক উপদেষ্টা ও তৎকালীন জাতীয় পরিষদ সদস্য প্রয়াত দেওয়ান ফরিদ গাজী এবং মিত্রবাহিনীর অধিনায়ক কর্ণেল বাগচী। সিলেট সরকারি কলেজ এলাকায় তখন পাকিস্তানি বাহিনীর শক্ত অবস্থান থাকলেও প্রকাশ্যে তারা বের হতে পারেনি। আত্মসমর্পণের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করায় মুক্তিযোদ্ধাদের খাদিমনগরে ফিরে যেতে হয়।
ওই দিন কদমতলী এলাকায় ৩৫ জনের একটি মিত্রবাহিনী দল একটি ইটখোলায় অবস্থানরত ২১ জন পাকিস্তানি সৈন্যের ওপর আক্রমণ চালায়। দীর্ঘ প্রায় নয় ঘণ্টার সম্মুখযুদ্ধের পর পাকিস্তানি সৈন্যরা আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। এ অভিযানে নেতৃত্ব দেন ভারতীয় সুবেদার রানা। তবে আত্মসমর্পণের পর মাছিমপুর থেকে ছোড়া একটি মর্টারের আঘাতে সুবেদার রানা নিহত হন এবং মিত্রবাহিনীর আরও দুই সদস্য আহত হন।
১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী সিলেট সরকারি কলেজ এলাকা থেকে তাদের অবস্থান প্রত্যাহার করে নেয়। ওই দিন দুপুরে দেওয়ান ফরিদ গাজী ও কর্ণেল বাগচী বিনা প্রতিরোধে শহর ও বিমানবন্দরের পাশের শত্রু ঘাঁটি পরিদর্শন করেন। একই সময়ে ‘জেড ফোর্স’-এর সেনারা এমসি কলেজ সংলগ্ন আলুরতলে সরকারি দুগ্ধ খামারের কাছে পৌঁছে গেলে পাকিস্তানি বাহিনী চারদিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
অবশেষে ১৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যোদ্ধারা দলবদ্ধভাবে সিলেট শহরে প্রবেশ করতে শুরু করেন। ‘জয় বাংলা, জয় বাংলা’ শ্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পাড়া-মহল্লা, অলিগলি। ১৫ ডিসেম্বর সকালে সর্বস্তরের মুক্তিপাগল মানুষের ঢল নামে শহরে। মাইকের মাধ্যমে ঘোষণা দেওয়া হয়-‘সিলেট হানাদার মুক্ত, সিলেট হানাদার মুক্ত’।
এই ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণে প্রতিবছর ১৫ ডিসেম্বর সিলেটে মুক্ত সিলেট দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

























