ইরানে গোপনে ঢুকে যেভাবে হামলা করে ইসরাইল
- আপডেট সময় : ০৩:১৫:০৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ জুন ২০২৫ ২৬১ বার পড়া হয়েছে
ভিউ নিউজ ৭১ ডেস্ক :
১২ দিনব্যাপী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইসরাইল শত শত যুদ্ধবিমান, সশস্ত্র ড্রোন ও জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানের মাধ্যমে ইরানে হামলা চালায়। তবে এর পাশাপাশি ইরানের ভেতর থেকেও গোপন অভিযান চালিয়ে সহায়তা করেছে মোসাদ ও ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর বিশেষ বাহিনী।
১৩ জুন ভোররাতে ইসরাইলি বাহিনী ও মোসাদ হামলা শুরু করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তারা কিছু ভিডিও প্রকাশ করে, যেগুলো রাতের বেলায় ইরানের অজ্ঞাত কিছু স্থানে ধারণ করা বলে মনে করা হয়।
একটি ঝাপসা ভিডিওতে দেখা যায়, মোসাদের কিছু অপারেটিভ রাতের অভিযানে ক্যামোফ্লাজ পোশাক ও নাইট-ভিশন চশমা পরে মরুভূমির মতো এলাকায় অবস্থান নিয়েছেন। তারা সেখান থেকে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আঘাত হানার জন্য অস্ত্র মোতায়েন করেন, যেন ইসরাইলি যুদ্ধবিমান সহজেই ঢুকতে পারে।
আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, স্পাইক মিসাইলের মতো ছোট কিন্তু নিখুঁত নিশানা করতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল প্ল্যাটফর্ম ও প্রতিরক্ষা ব্যাটারিতে আঘাত করছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষও এসব অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম থেকে জানা যায়, ইরানের একটি উন্মুক্ত এলাকায় পাওয়া গেছে স্পাইক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের কাস্টমাইজড লঞ্চারের ধ্বংসাবশেষ। এসব অস্ত্র ইন্টারনেট-নির্ভর স্বয়ংক্রিয় ও দূরনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় পরিচালিত হতো এবং ইসরাইলি সন্ত্রাসী মোসাদ এজেন্টদের দ্বারা চালানো হয়েছে বলে জানানো হয়।

এই ধরনের অভিযান ইসরাইলের পুরনো কৌশলের অংশ, যেমন ২০২০ সালের নভেম্বরে ইরানের শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী মোহসেন ফখরিজাদেহকে হত্যার সময় দেখা গিয়েছিল। সেই ঘটনায়ও মোসাদ দূরনিয়ন্ত্রিত ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত অস্ত্র ব্যবহার করে তেহরানের কাছাকাছি একটি শহরে ফখরিজাদেহকে হত্যা করে। পরে জানা যায়, একটি এক টন ওজনের মেশিনগান টুকরো টুকরো করে ইরানে ঢোকানো হয় এবং একটি পিকআপ ট্রাকে সেটি স্থাপন করা হয়, যেটি হত্যার পর বিস্ফোরিত হয়।
ফখরিজাদেহ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ইরান বুধবার পশ্চিম আজারবাইজান প্রদেশে তিন ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে।
ইরানের ভেতরে ড্রোন তৈরি করে ইসরাইল
যুদ্ধে ইসরাইল প্রচুর সংখ্যক ছোট বিস্ফোরক-ভর্তি ড্রোন ও কোয়াডকপ্টার ব্যবহার করে ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে দেয়ার চেষ্টা করে। ইরানের সংবাদমাধ্যম জানায়, ছোট ড্রোন ও বড় ধরনের সামরিক ড্রোন (যেমন হার্মেস ৯০০) ঠেকাতে দেশজুড়ে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়। কিছু ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করলেও আসলে কতগুলো ড্রোন ব্যবহার হয়েছে ও কতটা সফল ছিল, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ছোট ড্রোনগুলো এতটাই আতঙ্ক ছড়ায় যে, ইরানি কর্তৃপক্ষ দেশজুড়ে রাতভর চিরুনি অভিযান শুরু করে। এই সময়েই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, ইরানে ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’-এর বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।

পরে ইরানজুড়ে পিকআপ ট্রাকের সন্ধান পাওয়া যায়, যেগুলোর পেছনে ড্রোন উৎক্ষেপণের জন্য বিশেষভাবে তৈরি লঞ্চ প্যাড ছিল। এগুলো নির্ধারিত লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছে ড্রোন উৎক্ষেপণ করত। একই কৌশল ব্যবহার করে জুনের শুরুতে ইউক্রেন রাশিয়ার গভীরে চারটি বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে এক-তৃতীয়াংশ কৌশলগত বোমারু বিমান ধ্বংস করেছিল।
তেহরান ও অন্যান্য শহরে ইরানি নিরাপত্তা বাহিনী সন্দেহভাজন ট্রাক বা গতিবিধি চিহ্নিত করতে রাতভর মোটরসাইকেল ও গাড়ি করে টহল দেয়। বহু স্থানে চেকপোস্ট বসানো হয়, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে, যেখানে লাখো মানুষ রাজধানী ত্যাগ করে পালিয়ে গিয়েছিল।
পরে জানা যায়, ইসরাইলি বাহিনী ইরানের অভ্যন্তরে ছোট ড্রোন তৈরির জন্য ছোট ছোট উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করেছিল। এমনই এক কেন্দ্র পাওয়া যায় তেহরানের দক্ষিণে শহরে রে-তে, যেখানে একটি তিনতলা ভবন ছিল ড্রোন, হোমমেড বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির কাজে ব্যবহৃত।
রাষ্ট্রীয় টিভিতে আরেকটি অভিযানের ভিডিও দেখানো হয়, যেখানে ছয়জন ইরানি ‘ মোসাদ এজেন্ট’ কোয়াডকপ্টার, টাইম বোমা, গ্রেনেড ও অন্যান্য অস্ত্র তৈরি করছিলেন। কিছু গাড়িতে বিস্ফোরক পুঁতে রাখা হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়, যদিও সরকারিভাবে তা নিশ্চিত করা হয়নি।
ধৃতদের চোখ বাঁধা ও হাত বাঁধা অবস্থায় টেলিভিশনে স্বীকারোক্তি দেখানো হয়। এমনকি বিচারপতি গুলামহোসেন মহসেন এজেই ও তেহরানের প্রধান সরকারি কৌঁসুলি আলি সালেহি সরাসরি একজন আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন, যিনি ছাদ থেকে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভিডিও ধারণ করে মোসাদের কাছে পাঠানোর কথা স্বীকার করেন।
‘আমরা সবাই নজরদারিতে’
ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর চিফ অব স্টাফ এয়াল জামির এক ভিডিও বার্তায় বলেন, তাদের কমান্ডো বাহিনী ‘শত্রু ভূখণ্ডে গোপনে অভিযান চালিয়েছে’ এবং এর ফলে ইসরায়েল ‘অপারেশনাল ফ্রিডম’ অর্জন করে। তবে তিনি স্পষ্ট করেননি, এটি ১৩ জুন রাতের অভিযানের কথাই কি না।

ইরানি কর্তৃপক্ষ ইসরাইলি কমান্ডো অভিযানের বিষয়ে সরাসরি কিছু বলেনি, তবে গোটা দেশে মার্কিন ও ইসরাইলের সঙ্গে সহযোগিতার অভিযোগে বহু গ্রেফতার হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কমপক্ষে ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইলি গুপ্তচর সংস্থা মোসাদের গোপন প্রস্তুতিই ১৩ জুনের চমকপ্রদ হামলার সাফল্যের মূল কারণ। এই হামলায় ইরানের বহু শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও পরমাণু বিজ্ঞানী নিহত হন। দেশটির কিছু বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ধ্বংস হয়, যার ফলে ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ক্ষমতা কমে যায়।
এছাড়া, ইসরায়েলপন্থী হ্যাকারদের সাইবার হামলায় ইরানের দুটি প্রধান ব্যাংক এবং সর্ববৃহৎ ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ কিছু সময়ের জন্য অচল হয়ে পড়ে।
এই সপ্তাহে প্রচারিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ইরানের বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) মহাকাশ বিভাগ প্রধান, ইসরাইলের হামলায় নিহত আমির আলি হাজিজাদেহ বলছেন, ‘আমাদের মোবাইল ও অন্যান্য যোগাযোগ যন্ত্রের মাধ্যমে আমরা সবাই মোসাদের নজরদারিতে আছি।’ ওই বক্তব্যে তিনি সবাইকে ফোন বন্ধ রাখতে ও সময়-সময় তা পরিবর্তন করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
ইসরাইলের হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান সরকার দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়। নেটব্লকস-এর মতে, এটি ছিল ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটগুলোর একটি এবং সম্ভবত বিশ্বের মধ্যেও অন্যতম।
এই নিষেধাজ্ঞা যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার দুই দিন পর বৃহস্পতিবারে তুলে নেওয়া হয়। যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।


























