সংবাদ শিরোনাম ::
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এখনো আক্রমণের মুখে: সম্পাদক পরিষদ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ট্রাষ্টের মাসবপ্যাপী সেহরি বিতরণ চলমান সিলেট ভারতীয় পণ্য ও গ্রেফতার দুই সিলেটে মাদক ব্যবসায়ীসহ গ্রেপ্তার ৮৪ সিলেটে গত ২৪ ঘন্টায় হামে ১ শিশুর মৃত্যু হবিগঞ্জের খোয়াই নদীর বাঁধ ভাঙন, ফসলি জমি প্লাবিত সিলেটে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা সুরমা নদীর তীর উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শনে সিসিক প্রশাসকঐতিহ্য রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর কুলাউড়া উপজেলায় পাহাড়ি ঢলে কুলাউড়া গোগালী ছড়া বাঁধ ভেঙে ১৫ গ্রাম প্লাবিত সিলেট ভারতীয় মসলার চালান উদ্ধার সিলেটের পীরমহল্লা থেকে অস্ত্রসহ আটক ১ সিলেটে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ১, ভর্তি ৪৩

ভুমধ্য সাগরে ১৩ যুবকের প্রাণ হারালে

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৪:৩৮:৫৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ মার্চ ২০২৩ ২১৭ বার পড়া হয়েছে

ফরিদপুরের সালথা বাজারের কাপড়ের দোকানি ছিলেন মো. বাদল হোসেন (৩০)। নিয়মিত নামাজ পড়া ও ধর্মীয় নিয়ম মেনে চলায় বাজারের ব্যবসায়ীরা তাকে আলাদা চোখে দেখতেন ও ভালোবাসতেন। সব মিলিয়ে তার ব্যবসা-বাণিজ্যও ভালোই চলছিল। বছর দশেক আগে বিয়ে করেন বাদল। তার তাসমিন নামে পাঁচ বছর বয়সি এক মেয়ে ও মো. জায়েদ ইসলাম নামে আট বছর বয়সি এক ছেলেসন্তান রয়েছে। ছেলে জায়েদ একটি মাদ্রাসায় পড়ে। 

এরই মধ্যে উন্নত জীবনের আশায় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন ইউরোপে পাড়ি জমানোর। স্বপ্ন অনুযায়ী ইতালি যাওয়ার জন্য আট লাখ টাকায় একটি দালাল চক্রের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। তবে দালালরা প্রথমে তাকে দুবাই ও পরে লিবিয়ায় নিয়ে যান। সেখান থেকে সাগরপথে ইতালি যাওয়ার সময় নৌকাডুবিতে তিনি নিখোঁজ হন। আর এতেই তার স্বপ্ন ওই সাগরে ডুবে যায়।

বাদল সালথার মাঝারদিয়া ইউনিয়নের মাঝারদিয়া গ্রামের মো. রফিক মাতুব্বরের ছেলে। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে বাদল মেজো। বাদলের পরিবারের সঙ্গে কথা হলে এসব তথ্য জানান তারা।

বুধবার বিকালে সরেজমিন বাদলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় তার পরিবারে চলছে শোকের মাতম। চিৎকার করে কাঁদছেন বৃদ্ধ মা-বাবা ও স্ত্রী। আর বাদলের ছোট সন্তান দুটি খেলাধুলা করছে। তারা যেন বুঝতেই পারছে না তার বাবা সাগরে ডুবে নিখোঁজ হয়েছেন।

এদিকে খবর পেয়ে আত্মীয়স্বজনও ছুটে আসছেন তার বাড়িতে। বাদলের শোকে পুরো বাড়ির পরিবেশ ভারি হয়ে উঠেছে।

একই ঘটনায় নগরকান্দার আরও ১২ যুবক নিখোঁজ হন। তারা হলেন- উপজেলার আটকাহনিয়া গ্রামের শফিকুল ইসলাম রাসেল (৩০), কৃষ্ণনগর গ্রামের মো. আল আমিন মাতুব্বর (২০), মো. মাহফুজ মোল্যা (২২), মো. আকরাম ব্যাপারী (২৭), বাশাগাড়ী গ্রামের মো. স্বপন ফকির (২৭), শংকরপাশা গ্রামের শামীম কাজী (২১),  মো. বিপুল (২৫), বিটুল শেখ (২৫), শ্রীঙ্গাল গ্রামের মো. মিরান শেখ (২২), তুহিন শেখ (২০), শাওন তালুকদার (২২) ও নাজমুল (২৫)।

এসব যুবক উন্নত জীবনের আশায় দালাল চক্রের মাধ্যমে অবৈধভাবে ইতালি যাচ্ছিল। এদের সঙ্গে বাদলও ছিল। এরা বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে, তা নিয়ে তাদের পরিবারের সদস্যরা চরম উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে সময় পার করছেন।

নিখোঁজ বাদলের ভাই আজিজুর রহমান বলেন, আমার ভাই বাদল দেশে থেকে ব্যবসা করে ভালোই ছিল। হঠাৎ তার বিদেশে যাওয়ার শখ জাগে। পরে দালাল চক্রের সদস্য নগরকান্দার বাশাগাড়ী গ্রামের ইমারত হোসেনের সঙ্গে আট লাখ টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয়। গত ৪ জানুয়ারি ঢাকা থেকে প্রথমে দুবাই যান। আমার ভাই বাদলের সঙ্গে নগরকান্দার মুজাহিদ, হোসেন, নাঈস ও জয়নাল নামে আরও চারজন একই প্লেনে দুবাই যান। সেখান থেকে তাদের লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। লিবিয়া থেকে গত ৯ মার্চ সাগরপথে ইতালির উদ্দেশে মোট ৪৭ জনকে একসঙ্গে নৌকায় ওঠানো হয়। সাগরের মাঝখানে যাওয়ার পর নৌকাটি ডুবে গেলে ৩০ জন নিখোঁজ হন। বাকি ১৭ জনকে উদ্ধার করা হয়। গত মঙ্গলবার ফোন করে সেখান থেকে বেঁচে যাওয়া মুজাহিদ এ খবর আমাদের জানিয়েছেন।

বাদলের মা ফরিদা বেগম বলেন, নৌকায় ওঠার আগে বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টার দিকে ভিডিও কলে আমার সঙ্গে বাদলের কথা হয়েছে। বাদল বারবার একটিই কথা বলেছিল মা দোয়া করো, আমি আজ সাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাব। একবার ইতালি যেতে পারলে আর আমাদের পিছু ফিরে তাকাতে হবে না। আমি ওকে বলেছিলাম, সাগর পাড়ি দিয়ে তোমার ইতালি যাওয়া লাগবে না, তুমি ফিরে আসো বাবা; কিন্তু বাদল বলল, মা আমি ফিরে আসতে চেয়েছিলাম, কিন্তু দালালরা আমাকে দেশে ফিরে আসতে দেয়নি। দালালদের কবলে পড়ে আমার সোনার ছেলেটা সাগরে ডুবে গেল। ওর লাশটাও নাকি পাওয়া যাবে না। ওকে ছাড়া কিভাবে বাঁচব আমি? কি হবে ওর শিশু সন্তানদের? কি হবে ওর স্ত্রীর? কে নেবে তাদের দায়িত্ব?

মানবপাচার চক্রের প্রধান মো. মুরাদ ফকির লিবিয়ায় পলাতক থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তার সহযোগী বাশাগাড়ী গ্রামের ইমারত মিয়া মোবাইল ফোনে সাংবাদিকদের বলেন, আমি মানবপাচারের আমি জড়িত নই। তবে আমার হাত দিয়ে দুই একজনের টাকা মুরাদ ফকিরকে দিয়েছি মাত্র। বাদলকেও মুরাদের মাধ্যমে পাঠিয়েছি। 

সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আক্তার হোসেন শাহিন বলেন, মানবপাচাররোধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব সময় সচেতন করা হচ্ছে। তারপরও মানবপাচার বন্ধ হচ্ছে না। যদি কেউ তথ্য প্রমাণসহ কোনো মানবপাচাকারীর তথ্য দিতে পারে, তাহলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, কেউ যদি বিদেশে গিয়ে উপার্জন করতে চায়, তাহলে বৈধপথে যাওয়ার বিকল্প নেই। অবৈধপথে গেলে জীবন দিতে হয়। অনাকাঙ্ক্ষিত এসব ঘটনা এড়াতে, বিএমইটির মাধ্যমে বা যুব উন্নয়ন থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে কম খরচে সরকারিভাবে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এত সুবিধা থাকার পরেও ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে যাওয়া বন্ধে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

ভুমধ্য সাগরে ১৩ যুবকের প্রাণ হারালে

আপডেট সময় : ০৪:৩৮:৫৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ মার্চ ২০২৩

ফরিদপুরের সালথা বাজারের কাপড়ের দোকানি ছিলেন মো. বাদল হোসেন (৩০)। নিয়মিত নামাজ পড়া ও ধর্মীয় নিয়ম মেনে চলায় বাজারের ব্যবসায়ীরা তাকে আলাদা চোখে দেখতেন ও ভালোবাসতেন। সব মিলিয়ে তার ব্যবসা-বাণিজ্যও ভালোই চলছিল। বছর দশেক আগে বিয়ে করেন বাদল। তার তাসমিন নামে পাঁচ বছর বয়সি এক মেয়ে ও মো. জায়েদ ইসলাম নামে আট বছর বয়সি এক ছেলেসন্তান রয়েছে। ছেলে জায়েদ একটি মাদ্রাসায় পড়ে। 

এরই মধ্যে উন্নত জীবনের আশায় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন ইউরোপে পাড়ি জমানোর। স্বপ্ন অনুযায়ী ইতালি যাওয়ার জন্য আট লাখ টাকায় একটি দালাল চক্রের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। তবে দালালরা প্রথমে তাকে দুবাই ও পরে লিবিয়ায় নিয়ে যান। সেখান থেকে সাগরপথে ইতালি যাওয়ার সময় নৌকাডুবিতে তিনি নিখোঁজ হন। আর এতেই তার স্বপ্ন ওই সাগরে ডুবে যায়।

বাদল সালথার মাঝারদিয়া ইউনিয়নের মাঝারদিয়া গ্রামের মো. রফিক মাতুব্বরের ছেলে। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে বাদল মেজো। বাদলের পরিবারের সঙ্গে কথা হলে এসব তথ্য জানান তারা।

বুধবার বিকালে সরেজমিন বাদলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় তার পরিবারে চলছে শোকের মাতম। চিৎকার করে কাঁদছেন বৃদ্ধ মা-বাবা ও স্ত্রী। আর বাদলের ছোট সন্তান দুটি খেলাধুলা করছে। তারা যেন বুঝতেই পারছে না তার বাবা সাগরে ডুবে নিখোঁজ হয়েছেন।

এদিকে খবর পেয়ে আত্মীয়স্বজনও ছুটে আসছেন তার বাড়িতে। বাদলের শোকে পুরো বাড়ির পরিবেশ ভারি হয়ে উঠেছে।

একই ঘটনায় নগরকান্দার আরও ১২ যুবক নিখোঁজ হন। তারা হলেন- উপজেলার আটকাহনিয়া গ্রামের শফিকুল ইসলাম রাসেল (৩০), কৃষ্ণনগর গ্রামের মো. আল আমিন মাতুব্বর (২০), মো. মাহফুজ মোল্যা (২২), মো. আকরাম ব্যাপারী (২৭), বাশাগাড়ী গ্রামের মো. স্বপন ফকির (২৭), শংকরপাশা গ্রামের শামীম কাজী (২১),  মো. বিপুল (২৫), বিটুল শেখ (২৫), শ্রীঙ্গাল গ্রামের মো. মিরান শেখ (২২), তুহিন শেখ (২০), শাওন তালুকদার (২২) ও নাজমুল (২৫)।

এসব যুবক উন্নত জীবনের আশায় দালাল চক্রের মাধ্যমে অবৈধভাবে ইতালি যাচ্ছিল। এদের সঙ্গে বাদলও ছিল। এরা বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে, তা নিয়ে তাদের পরিবারের সদস্যরা চরম উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে সময় পার করছেন।

নিখোঁজ বাদলের ভাই আজিজুর রহমান বলেন, আমার ভাই বাদল দেশে থেকে ব্যবসা করে ভালোই ছিল। হঠাৎ তার বিদেশে যাওয়ার শখ জাগে। পরে দালাল চক্রের সদস্য নগরকান্দার বাশাগাড়ী গ্রামের ইমারত হোসেনের সঙ্গে আট লাখ টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয়। গত ৪ জানুয়ারি ঢাকা থেকে প্রথমে দুবাই যান। আমার ভাই বাদলের সঙ্গে নগরকান্দার মুজাহিদ, হোসেন, নাঈস ও জয়নাল নামে আরও চারজন একই প্লেনে দুবাই যান। সেখান থেকে তাদের লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। লিবিয়া থেকে গত ৯ মার্চ সাগরপথে ইতালির উদ্দেশে মোট ৪৭ জনকে একসঙ্গে নৌকায় ওঠানো হয়। সাগরের মাঝখানে যাওয়ার পর নৌকাটি ডুবে গেলে ৩০ জন নিখোঁজ হন। বাকি ১৭ জনকে উদ্ধার করা হয়। গত মঙ্গলবার ফোন করে সেখান থেকে বেঁচে যাওয়া মুজাহিদ এ খবর আমাদের জানিয়েছেন।

বাদলের মা ফরিদা বেগম বলেন, নৌকায় ওঠার আগে বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টার দিকে ভিডিও কলে আমার সঙ্গে বাদলের কথা হয়েছে। বাদল বারবার একটিই কথা বলেছিল মা দোয়া করো, আমি আজ সাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাব। একবার ইতালি যেতে পারলে আর আমাদের পিছু ফিরে তাকাতে হবে না। আমি ওকে বলেছিলাম, সাগর পাড়ি দিয়ে তোমার ইতালি যাওয়া লাগবে না, তুমি ফিরে আসো বাবা; কিন্তু বাদল বলল, মা আমি ফিরে আসতে চেয়েছিলাম, কিন্তু দালালরা আমাকে দেশে ফিরে আসতে দেয়নি। দালালদের কবলে পড়ে আমার সোনার ছেলেটা সাগরে ডুবে গেল। ওর লাশটাও নাকি পাওয়া যাবে না। ওকে ছাড়া কিভাবে বাঁচব আমি? কি হবে ওর শিশু সন্তানদের? কি হবে ওর স্ত্রীর? কে নেবে তাদের দায়িত্ব?

মানবপাচার চক্রের প্রধান মো. মুরাদ ফকির লিবিয়ায় পলাতক থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তার সহযোগী বাশাগাড়ী গ্রামের ইমারত মিয়া মোবাইল ফোনে সাংবাদিকদের বলেন, আমি মানবপাচারের আমি জড়িত নই। তবে আমার হাত দিয়ে দুই একজনের টাকা মুরাদ ফকিরকে দিয়েছি মাত্র। বাদলকেও মুরাদের মাধ্যমে পাঠিয়েছি। 

সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আক্তার হোসেন শাহিন বলেন, মানবপাচাররোধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব সময় সচেতন করা হচ্ছে। তারপরও মানবপাচার বন্ধ হচ্ছে না। যদি কেউ তথ্য প্রমাণসহ কোনো মানবপাচাকারীর তথ্য দিতে পারে, তাহলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, কেউ যদি বিদেশে গিয়ে উপার্জন করতে চায়, তাহলে বৈধপথে যাওয়ার বিকল্প নেই। অবৈধপথে গেলে জীবন দিতে হয়। অনাকাঙ্ক্ষিত এসব ঘটনা এড়াতে, বিএমইটির মাধ্যমে বা যুব উন্নয়ন থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে কম খরচে সরকারিভাবে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এত সুবিধা থাকার পরেও ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে যাওয়া বন্ধে সবাইকে সচেতন হতে হবে।