সংবাদ শিরোনাম ::
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এখনো আক্রমণের মুখে: সম্পাদক পরিষদ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ট্রাষ্টের মাসবপ্যাপী সেহরি বিতরণ চলমান কারবালার যুদ্ধে মাওলা আবুল ফজল আব্বাস আলামদার (আঃ)-এর শাহাদাত হযরত শাহজালাল (রহ.) এর মাজারের দানবাক্স বিতর্ক আর এক রহস্যময় বার্তা দিলেন সাবেক সিটি মেয়র ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সিলেটের ডিসি সারওয়ার আলমের বিত্তান্ত তালামীযে ইসলামিয়া সিলেট মহানগর শাখার কাউন্সিল সম্পন্ন,আরিফ সামাদ সভাপতি, মাহমুদুর রহমান সাধারণ সম্পাদক জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন সফলে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে,পরিকল্পনা সভায় সিসিক প্রশাসক মার্কিন আধিপত্যের অবসান,বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সুপারকম্পিউটার এখন চীনের হাতে বেইজিং পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মাধবপুরে অপহরণকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ সিলেটে ৪২ লাখ টাকার ভারতীয় জিরাসহ গ্রেফতার ১, সিলেট অঞ্চলে আবারও বাড়ছে সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি

কারবালার যুদ্ধে মাওলা আবুল ফজল আব্বাস আলামদার (আঃ)-এর শাহাদাত

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:২৪:২৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিনিধি :

মাওলা আব্বাস সম্পর্কে মাওলা আলী (আঃ) সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন এই হচ্ছে আব্বাস, হাশেমী বংশের চাঁদ। যতক্ষণ আব্বাস জীবিত ছিলেন, ততক্ষণ কারবালায় যুদ্ধ চলছিল। আব্বাস জমিনে পড়ে গেলেন, আর তারপর থেকেই কারবালার বুকে জুলুম শুরু হলো। সৈয়দদের কত বড় ভরসা ছিল গাজীর ওপর আলীর কন্যাদের পরম আস্থা ছিল এই বাহুদ্বয়ের ওপর।

কারবালার যুদ্ধ তখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। একে একে মাওলা হুসাইন (আঃ)-এর বিশ্বস্ত সঙ্গীরা ময়দানে গিয়ে শাহাদাত বরণ করছিলেন। প্রতিবার কোনো শহীদের লাশ তাঁবুতে আনা হলে, আব্বাস (আঃ) মাওলা হুসাইনের কাছে এসে বলতেন আকা এবার আমাকে যাওয়ার অনুমতি দিন। আমার হৃদয় সংকুচিত হয়ে আসছে এবং জীবন থেকে আমি তৃপ্তি লাভ করেছি। আমি মুনাফিকদের ওপর আমার ভাইদের রক্তের প্রতিশোধ নিতে চাই। কিন্তু প্রতিবারই মাওলা হুসাইন (আঃ) তাঁকে শান্ত করে বলতেন_”না” আব্বাস তুমি আমার লশকরদের পতাকাবাহক। তুমি চলে গেলে আমার সৈন্যদল ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবে। তুমি আমার ডান হাত, আমার ভরসা।

একে একে মাওলা হুসাইন (আঃ)-এর বিশ্বস্ত সঙ্গীরা ময়দানে গিয়ে শাহাদাত বরণ করছিলেন। আউন (আঃ) ও মুহাম্মদ (আঃ) বিদায় নিলেন। কাসিম (আঃ) ময়দানে গেলেন এবং তাঁর দেহ ঘোড়ার খুরে পিষ্ট হয়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। এ দৃশ্য দেখে আব্বাস (আঃ) অত্যন্ত অস্থির হয়ে পড়লেন। বারবার তিনি মাওলা হুসাইন (আঃ)-এর তাঁবুর দিকে যাচ্ছিলেন আর ফিরে আসছিলেন। কীভাবে তিনি আকাকে রাজি করাবেন, সেই চিন্তায় আব্বাসের হৃদয় ব্যাকুল হয়ে উঠছিল। ঠিক তখনই ছোট্ট বিবি সকিনা (সাঃ আঃ) তাঁর শুকনো মশকটি হাতে নিয়ে চাচা আব্বাসের কাছে এলেন চাচা আব্বাস, আমার মশকটা দেখুন। আমি খুব পিপাসার্ত, প্রিয় চাচা।

মাসুম বিবি সকিনার (সাঃ আঃ) কথা শুনে আব্বাস (আঃ) ইমামের দরবারে যাওয়ার একটি অসিলা খুঁজে পেলেন। তিনি ছোট্ট সকিনাকে কোলে তুলে নিয়ে মাওলা হুসাইন (আঃ)-এর তাঁবুতে প্রবেশ করলেন এবং ইমামের সামনে বসে পড়লেন। আব্বাস (আঃ)-কে নিজের মুখে কিছুই বলতে হলো না। ​মাওলা হুসাইন (আঃ) প্রথমে আব্বাসের দিকে তাকালেন, তারপর সকিনার দিকে এবং সবশেষে তাঁর শুকনো মশকের দিকে। তিনি ভাইয়ের মনের আকুতি সব বুঝে গেলেন।

মাওলা বললেন আব্বাস, এখন আমি তোমাকে কীভাবে না বলি? তুমি সকিনাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছ। যাও, আব্বাস, যাও; সকিনার মশক পানি দিয়ে ভরে নিয়ে এসো। তবে আমার একটি অনুরোধ তোমার তলোয়ারটি আমার কাছে রেখে যাও। আব্বাস কেঁদে বললেন, তলোয়ারটাই যদি আকা আপনাকে দিয়ে যেতে হয়, তবে আমি লড়ব কীভাবে? মাওলা হুসাইন বললেন, তোমাকে লড়ার জন্য পাঠাচ্ছি না, মনে রেখো, তুমি যুদ্ধ করতে যাচ্ছ না, শুধু সাকিনা ও বাচ্চাদের জন্য পানি আনতে যাচ্ছ।

মাওলা আব্বাস (আঃ) তাকিয়ে বললেন, আকা তলোয়ার আমার হাতেই থাকতে দিন। আমি ওয়াদা করছি যে আমি যুদ্ধ করবো না। তখন ​মাওলা হুসাইন (আঃ) তলোয়ারটি নিজের হাতে নিলেন এবং বললেন:

আব্বাস, তুমি যদি তলোয়ার নিয়ে যেতে চাও, তবে এই নাও। ওদের যত পারো মারো, যত পারো দৌড় করাও। কিন্তু আমি ইমাম হিসেবে তোমাকে বলছি যত আঘাত তুমি আজ ইয়াজিদ বাহিনীকে করবে, তার বদলা পরবর্তীতে আমার জয়নবকে (সাঃ আঃ) দিতে হবে, তার বদলা আমার সাকিনাকে (সাঃ আঃ) দিতে হবে আব্বাস, তোমাকে আজ ওদের দৌড় করাতে হবে, কারণ পরবর্তীতে ওরা কখনও উটের সামনে সাকিনাকে, কখনও ঘোড়ার সামনে সাকিনাকে নির্মমভাবে দৌড় করাবে। এ কথা শুনে আব্বাস তলোয়ার বালির ওপর ছুঁড়ে ফেললেন এবং কেঁদে বললেন, আকা আমাকে আগে কেন বলেননি যে এর বদলা আমার মজলুম বোনদের দিতে হবে। আব্বাস (আঃ) তাঁর প্রিয় তলোয়ারটি ইমামের কাছে দিয়ে দিলেন এবং সকিনাকে চুম্বন করে মাটিতে নামিয়ে বললেন সকিনা, আমার জন্য দোয়া করো।

সাইয়্যেদা বিবি জয়নাব (সাঃআঃ) মাওলা আব্বাস (আঃ)-এর চেয়ে প্রায় ২২ বছরের বড় ছিলেন। ছোট ভাই আব্বাসকে তিনি নিজের সন্তানের মতো, স্নেহ করতেন। কারবালার সেই বিদায়ের মুহূর্তে বিবি জয়নাব (সাঃ আঃ) ব্যাকুল হয়ে আব্বাসকে কাছে ডাকলেন এবং নিজের দুই হাত তুলে ভাইয়ের গলা জড়িয়ে ধরলেন। জয়নাব (সাঃআঃ) আব্বাসকে বুকে চেপে ধরে অশ্রুসিক্ত নয়নে কারবালার মাটিতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন:

ভাই আব্বাস, বাবা মাওলা আলী (আঃ) আমাকে বলেছিলেন একদিন কুফা ও শামের শহরে আমাকে বন্দী করা হবে, আমার মাথা থেকে হিজাব ছিনিয়ে নেওয়া হবে। বাবার কথা চিরসত্য, তাই আমার বিশ্বাস ছিল আমার সাথে এটি অবশ্যই ঘটবে। কিন্তু ভাই, আমি এক চিন্তায় ছিলাম আমি ভাবতাম, কার এত বড় দুঃসাহস আর কার এমন বুকের পাটা হবে যে, আমার গাজী আব্বাসের মতো ভাই থাকতে আমাকে বন্দী করবে? কে আমার মাথা থেকে চাদর ছিনিয়ে নেবে? কিন্তু ভাই আব্বাস, আজ কারবালার এই ময়দানে তুমি যখন তলোয়ার ছাড়া ফোরাতের দিকে যাচ্ছ, তখন আমার বিশ্বাস, আমার হিজাব লুট হতে আর দেরি নেই। কুফা ও শামের শহরে বন্দী হিসেবে আমাকে ঘুরানো হবে বাজারে বাজারে।

মাওলা আব্বাস যখন ময়দানে যাচ্ছিলেন, মাওলা হুসাইন (আঃ) তাঁর পিছু পিছু চললেন। হুসাইনের কণ্ঠ শোনা গেল, ভাই আব্বাস, তুমি কি যাচ্ছ? হ্যাঁ মাওলা আমি যাচ্ছি। তলোয়ার ছাড়াই আব্বাসের ঘোড়া ফোরাতের দিকে ছুটে চলল। এক হাতে হুসাইনি ইসলামের পবিত্র আলম, অন্য হাতে বর্শা ও সকিনার মশক। যুদ্ধের জন্য তাঁর কাছে কোনো তলোয়ার ছিল না, কেবল আত্মরক্ষার জন্য ছিল একটি বর্শা। ৪ হাজার শত্রু সৈন্য ফোরাত নদী পাহারা দিচ্ছিল। এসব সৈন্য চারদিক থেকে উনাকে ঘেরাও করে তীর ছুড়তে লাগল। কিন্তু মাওলা আলী (আঃ)-এর পুত্র একাই অসংখ্য এজিদ বাহিনীকে হত্যা করে তাদেরকে দুভাগ করে ফেললেন। তিনি সা’দের সৈন্যবাহিনীর প্রাণকেন্দ্র বরাবর অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখে ফোরাতের শাখায় গিয়ে পৌঁছালেন।

অতল জলের তীরে দাঁড়িয়ে মারাত্মক তৃষ্ণার্ত থাকা সত্ত্বেও, আকা হোসাইন (আঃ) বিবি সকিনা (সাঃ) এবং তাঁবুর নিষ্পাপ শিশুদের কথা স্মরণ করে আনুগত্যের নিদর্শন হিসেবে তিনি এক ফোঁটা পানিও পান করলেন না। তিনি দু’হাতে তোলা পানি আবার নদীতে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন তাঁর ইমাম ও শিশুরা তৃষ্ণার্ত থাকা অবস্থায় তিনি নিজে পানি পান করতে পারেন না। ​তিনি মশকটি পূর্ণ করে যখন তিনি তাঁর বিশ্বস্ত ঘোড়াকে পানি পান করাতে চাইলেন। কিন্তু ঘোড়াটি যেন হুসাইনের শিবিরের দিকে মুখ ফিরিয়ে ইশারায় বলছিল মালিক, সকিনা ও ইমাম যেখানে পিপাসায় কাতর, সেখানে আমি কীভাবে পানি পান করি? আগে তাঁদের কাছে পানি পৌঁছে যাক। আব্বাস (আঃ) এক হাতে পতাকা এবং অন্য হাতে বর্শা ও পানিভর্তি মশক নিয়ে শিবিরের দিকে ফিরে চললেন।

ওদিকে তখন তাঁবু থেকে মাসুম বিবি সকিনার (সাঃ আঃ) জবানীতে রণাঙ্গনের খবর আসছিল: বাবা, আমার চাচা ময়দানে যাচ্ছেন। হুসাইন বললেন, মারহাবা। বাবা, আমার চাচা মাকতালে পৌঁছে গেছেন।হুসাইন বললেন, মারহাবা মা উম্মুল বানিনের সন্তান। বাবা, আমার চাচার ঘোড়া ফোরাত নদীতে নেমে গেছে। বাবা, ফোরাতের ঘাট খালি হয়ে গেছে। বাবা, আমার চাচা মশক ভরে নিয়েছেন বাবা, আমি কি আপনাকে বলিনি? আমার চাচা ময়দানে গেলে পানি নিয়ে আসবেন। ​একথা শুনে মাওলা হুসাইন (আঃ) ব্যথায় কপাল চাপড়ে বালি মাথায় দিলেন এবং বললেন, দোয়া করো এবার যেন পানি নিয়ে আসতে পারেন। ​ওদিকে আবার সকিনার আওয়াজ এল,ঐ দেখুন বাবা, চাচার ঘোড়া ফোরাত থেকে বের হয়ে এসেছে। চাচার ঘোড়া তাঁবুর দিকে আসছে। এই বলতে বলতে সকিনা বালির ওপর পড়ে গেলেন এবং কেঁদে বলতে লাগলেন, বাবা, সৈন্যরা চাচাকে ঘিরে ফেলেছে বাবা, চারপাশ থেকে লশকর এসে গেছে। মাওলা হুসাইন (আঃ) কোমরে হাত দিয়ে বসে পড়লেন। সকিনার আর্তনাদ শোনা গেল, বাবা, চাচার ডান হাত কেটে পড়ে গেছে। হুসাইন উপুড় হয়ে বালির ওপর লুটিয়ে পড়লেন এবং কেঁদে বলতে লাগলেন, হায় ফাতেমা জহুরা (সাঃ আঃ) সকিনার শেষ আওয়াজ এল, বাবা, আমার চাচার দ্বিতীয় হাতটিও কেটে পড়ে গেছে, হুসাইনের বুক চিরে আওয়াজ এল, হায় অসহায়ত্ব।

উমর ইবনে সা’দ তার লশকরদের নির্দেশ দিল আব্বাসকে এই পানি নিয়ে তাঁবুতে ফিরতে দিও না আব্বাস পানি নিয়ে ফিরলে সন্ধ্যা নাগাদ ওদের পরাজিত করা যাবে না। পাষাণ শত্রুরা চারদিক থেকে মওলা আব্বাসকে অবরুদ্ধ করে ফেলল। সবদিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে তীর বর্ষিত হতে লাগল।

এখানে ইতিহাসের সেই নির্মম সত্যটি উন্মোচিত হয় মাওলা আব্বাসের দুই হাত এক সময়ে কাটা পড়েনি। শত্রুরা একযোগে তাঁর সামনে আসার সাহস পায়নি তারা কাপুরুষের মতো জঙ্গল ও খেজুর বাগানের আড়াল থেকে ওত পেতে আক্রমণ করেছিল। প্রথমে জুরার বিন মুররাহ নামক এক অভিশপ্ত সৈন্য পেছন থেকে তরবারির আঘাত করে মাওলা আব্বাসের ডান বাহুটি বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ডান হাত হারিয়েও আব্বাস (আঃ) দমে যাননি, তিনি মশকটি বাম হাতে তুলে নেন এবং যাত্রা অব্যাহত রাখেন। এরপর হাকিম বিন তুফাইল নামক আরেক পাপিষ্ঠ পেছন থেকে আক্রমণ করে তাঁর বাম বাহুটিও কেটে ফেলে। ইসলামের পবিত্র আলাম মাটিতে পড়ে যায়।

দুই বাহু হারিয়েও আব্বাস (আঃ) ঘোড়ার পিঠে থেকে কেবল দাঁতের মধ্যে চেপে ধরে রইলেন সকিনার মশক তবুও তাঁর অন্তরের একমাত্র চিন্তা এই পানি যেকোনো মূল্যে সকিনার কাছে পৌঁছাতেই হবে। তাঁর বিশ্বস্ত ঘোড়াটিও যেন পানি না খেয়ে সকিনার তৃষ্ণার প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করছিল।

মশকটি তখনও পানিতে পূর্ণ ছিল। ঠিক সেই সময় এক অভিশপ্ত তীরন্দাজ তীর ছুঁড়ল। তীরটি সরাসরি এসে মশকে বিদ্ধ হলো এবং সমস্ত পানি কারবালার তপ্ত বালুর বুকে ঝরে পড়ে গেল মশক থেকে পানি বেরিয়ে যেতে দেখে আব্বাস (আঃ) যেন তাঁর জীবনের সমস্ত আত্মিক শক্তি হারিয়ে ফেললেন। তাঁর মনে হলো, তিনি সকিনার কাছে করা ওয়াদা রক্ষা করতে পারলেন না। এরপর আরেকটি নির্মম তীর সরাসরি এসে তাঁর পবিত্র চোখে বিদ্ধ হলো এবং বনি তামিম গোত্রের এক সওয়ারি ভারী লোহার গুর্জ হাতুড়ি জাতীয় অস্ত্র দিয়ে তাঁর মাথায় প্রচণ্ড আঘাত করল। হাত না থাকায় মাটিতে ভর দেওয়ার কোনো উপায় ছিল না মাওলা আলীর সিংহপুত্র রক্তাক্ত দেহে ঘোড়ার পিঠ থেকে সরাসরি তপ্ত জমিনে আছড়ে পড়লেন।

জমিনে পড়েই যন্ত্রণাকাতর কণ্ঠে, পরম ভক্তিতে মাওলা আব্বাস কারবালার ধুলোবালি থেকে উচ্চস্বরে বলে উঠলেন, হে আবা আবদিল্লাহ আপনার এই হাতহীন গোলামের শেষ সালাম গ্রহণ করুন আকা জলদি আসুন আপনার আব্বাস আর পারছে না, ভাইয়ের এই বুকফাটা শেষ আকুতি যখন মাওলা হুসাইন (আঃ)-এর কানে পৌঁছাল, তখন মাওলার মনে হলো যেন আকাশটি তাঁর মাথায় ভেঙে পড়েছে। তিনি দুই হাত দিয়ে নিজের কোমর চেপে ধরলেন এবং বিলাপ করে চিৎকার করে বললেন, হে আব্বাস আজ আমার মেরুদণ্ড ভেঙে গেল?

পাপিষ্ঠ ইয়াজিদ বাহিনী মাওলা হুসাইন পৌঁছানোর আগেই কারবালার মাটিতে আব্বাসের পবিত্র দেহকে নিষ্ঠুরভাবে ছিন্নভিন্ন করে চারদিকে ছড়িয়ে দিয়েছিল তারা কেবল হাত কাটার ওপর ক্ষান্ত হয়নি, বরং মাওলা আলীর সিংহের ওপর তাদের এত ক্ষোভ ও ভয় ছিল যে, কোথাও আব্বাসের হাত ফেলে রেখেছিল, কোথাও আব্বাসের পা কেটে ফেলে রেখেছিল

ভাইয়ের খোঁজে মাওলা হুসাইনের বিশ্বস্ত ঘোড়া জুলজানা ছুটে চলল। কিন্তু কিছুটা দূরে গিয়ে জুলজানা হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। হুসাইন বললেন, জুলজানা, তুমি কি ক্লান্ত হয়ে গেছ? জুলজানা নিজের কাঁপতে থাকা শরীর নিয়ে মাথা নিচু করে তার খুর দিয়ে জমিনে ইশারা করল। হুসাইন তাকিয়ে দেখলেন, আব্বাসের কেটে যাওয়া ডান হাতটি রাস্তায় পড়ে আছে হুসাইন ঘোড়ার জিন থেকে জমিনে পড়ে গেলেন এবং ভাইয়ের সেই হাতটি বুকে তুলে কেঁদে বললেন, এর ওপর বোন জয়নবের কত বড় ভরসা ছিল এই বাহুদ্বয়ের ওপর আলীর কন্যাদের কত বড় ভরসা ছিল।

অসহায় হুসাইন কারবালার তপ্ত বালুর বুকে হেঁটে হেঁটে, উথাল-পাথাল কেঁদে কেঁদে বলছিলেন: কেউ কি আছ, যে আমার গাজীর এই ছিন্নভিন্ন অঙ্গগুলো এক জায়গায় জড়ো করে দেবে? কেউ কি আছ, যে আমাকে আমার আব্বাসকে ফিরিয়ে দেবে?

হুসাইন যখন ঘাতকদের ভীড়ে আব্বাসের কাছে পৌঁছালেন, দেখলেন শরীরের সব জায়গায় জখম, গুর্জের আঘাতে মাথা চৌচির, কিন্তু তখনও মুখ থেকে মশক ছাড়েননি। হুসাইন আব্বাসের মাথা মোবারক নিজের কোলে তুলে নিলেন। আব্বাস (আঃ) বললেন আকা, হাত দুটোও নেই যে রক্ত মুছে আপনাকে একনজর দেখব। ছোটবেলায় আম্মাজানের মুখে শুনেছিলাম, দুনিয়ায় এসে আমি সর্বপ্রথম আপনার চেহারা মোবারক দেখেছিলাম। আজ বিদায় নেওয়ার আগেও আপনার চেহারা দেখে মরতে চাই। কিন্তু এক চোখে তীর বিদ্ধ, অন্য চোখ রক্তে রঞ্জিত।

মাওলা হুসাইন (আঃ) নিজ হাতে ভাইয়ের চোখ থেকে জমাট বাঁধা রক্ত মুছে দিলেন। আব্বাস (আঃ) পরম ভালোবাসা ভরা দৃষ্টিতে ইমামের দিকে তাকালেন। মাওলা হোসেন বললেন আব্বাস, সারা জীবন তুমি আমাকে আকা বলে ডেকেছ। তোমার মুখ থেকে ভাই ডাক শোনার জন্য ব্যাকুল থাকতাম। শেষবারের মতো আমাকে একবার ভাই বলে সম্বোধন করো।

আব্বাস (আঃ) অশ্রুসিক্ত নয়নে বললেন, ইবনে রাসুলিল্লাহ হুসাইন, আমার ভাই আমার এই ক্ষতবিক্ষত দেহ তাঁবুতে নিয়ে যাবেন না। আমি বড় লজ্জিত, ভাই আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েও সকিনাকে পানি দিতে পারিনি, খালি হাতে আমি তাকে মুখ দেখাতে পারব না। এরপর মাওলা আব্বাস (আঃ) হুসাইন (আঃ)-এর কোলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে শাহাদাতের পেয়ালা পান করলেন। মাওলা হোসেন (আঃ) তাঁর মস্তক মোবারক বুকে চেপে ধরে চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন, আব্বাস তোমার মৃত্যুতে আজ আমার মেরুদণ্ড ভেঙে গেল, আজ আমার সমস্ত শক্তি শেষ হয়ে গেল, আমার ভরসা চলে গেল, আমার আলামদার চলে গেল।

মাওলা হুসাইন (আঃ) একা হাতে ভূমিতে পড়ে থাকা রক্তমাখা পতাকাটি তুলে নিলেন এবং শূন্য, খালি মশকটি তাতে বেঁধে নিলেন। দূর শিবিরে দাঁড়িয়ে মাসুম সকিনা (সাঃ আঃ) দূর থেকে শুধু পতাকাটি আসতে দেখতে পেলেন। তিনি আনন্দে চিৎকার করে বাকি শিশুদের ডেকে বললেন বাচ্চারা এসো, জলদি এসো আমার চাচা আব্বাস পানি নিয়ে আসছেন। আমি তোমাদের সবাইকে পানি দেব। এসো, সবাই মশক নিয়ে এসো? সকিনা (সাঃ আঃ) যখন শিশুদের নিয়ে মশক হাতে আনন্দের সাথে অপেক্ষা করছিলেন, তখনই কারবালার তপ্ত বাতাস স্তব্ধ হয়ে গেল।

মাওলা হুসাইন (আঃ) যখন শূন্য হাতে তাঁবুর কাছে পৌঁছালেন, তিনি অত্যন্ত ক্লান্ত ও ভগ্নস্বরে ডেকে উঠলেন
জয়নব?(সাঃআঃ) জয়নব?(সাঃআঃ) আমাকে সাহায্য করো কারবালার পতাকা ফিরে এসেছে কিন্তু পতাকাবাহক আর ফিরে আসেনি। ফোরাতের তীর থেকে হায়দারের বীর হৃদয় আর ফিরে আসেনি।

চাচা আব্বাসের শাহাদাতের এই খবর শুনে সকিনা (সাঃ আঃ)-এর হাতের ছোট্ট মশকটি বালুর বুকে খসে পড়ল। তিনি আর সইতে পারলেন না, চাচার বিরহে কাঁদতে কাঁদতে তপ্ত বালুর ওপরই অচেতন হয়ে গেলেন। অচেতন হয়ে যাওয়ার পর সকিনা (সাঃ আঃ) এক করুণ স্বপ্ন দর্শন করলেন। তিনি স্বপ্নে দেখলেন, তাঁর চাচা গাজী আব্বাস (আঃ) নূরানী বেশে তাঁর সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু স্বপ্নের মধ্যেও চাচার সেই দুই পবিত্র বাহু নেই? সকিনা (সাঃ আঃ) স্বপ্নে চাচার সেই অবয়ব দেখে কেঁদে কেঁদে জড়িয়ে ধরতে চাইলেন, কিন্তু হাত না থাকায় চাচা আব্বাস তাকে বুকে টেনে নিতে পারলেন না। সকিনা (সাঃ আঃ) স্বপ্নে আর্তনাদ করে বললেন:

চাচাজান আপনি কোথায় চলে গেলেন? আমার আব্বাস চাচা আমি আর কখনো আপনার কাছে পানি চাইব না। আমার আর পানির তৃষ্ণা নেই, চাচা আপনি শুধু তাঁবুতে ফিরে আসুন। আপনি ছাড়া যে আমাদের আর কোনো ভরসা নেই। দেখুন, পাপিষ্ঠরা আমাদের তাঁবুর চারপাশ ঘেরাও করে ফেলেছে। স্বপ্নের মাঝেই চাচা আব্বাসের চোখ থেকে অশ্রু ঝরে পড়ল। তিনি বললেন, মা সকিনা তোমার চাচা লজ্জিত। শত্রুরা আমার দুই হাত কেটে ফেলেছে, নয়তো আব্বাস বেঁচে থাকতে আমার সকিনা তৃষ্ণার্ত থাকত না।

যখন বিবি সকিনা (সাঃ আঃ) এর চোখ খুলল, তিনি নিজেকে ফুফু আম্মাজান জয়নব (সাঃ আঃ)-এর কোলে দেখতে পেলেন। ফোরাতের পানির তৃষ্ণা আর চাচার ফিরে আসার আশা সবকিছু কারবালার বুকে চিরতরে বিলীন হয়ে গেল। সেই রাত থেকেই শুরু হলো আলীর কন্যাদের ওপর এজিদ বাহিনীর নির্মম জুলুম ও তাবু জ্বালিয়ে দেওয়ার তাণ্ডব।

সংক্ষিপ্ত কারবালার বিবরণ:

বিবি সাকিনা ছিলেন – বিবি সাকিনা, যার আসল নাম ফাতিমা কুবরা, ছিলেন ইমাম হুসাইন (আঃ)এবং বিবি রুবাবের আদরের কন্যা। কারবালার সময় তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৩ থেকে ৪ বছর। তাঁর বাবা তাঁকে সাকিনা বলে ডাকতেন, যার অর্থ শান্তি/স্থিরতা, কারণ তাঁর উপস্থিতি তাঁকে শান্তি দিত। তিনি ইমাম হুসাইনের প্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত ছিলেন।

‎‎‎মহররমের ৯ তারিখ রাতে,যখন ইমাম হুসাইন আঃ তাঁর পরিবারকে বললেন যে শাহাদাত বরণ নিশ্চিত, তখন ছোট্ট সাকিনা কাঁদতে শুরু করল।তিনি তার বাবার পা জড়িয়ে ধরে বললো,বাবা!তুমি কি আমাদের একা ছেড়ে যাবে? তোমার পরে আমাদের কে থাকবে? ‎হুসাইন (আঃ) তাকে তুলে নিলেন,তার চোখের জল মুছে দিলেন এবং বললেন,আমার সাকিনা,তোমার বাবা তোমাকে ছেড়ে যাচ্ছেন না। আমি চলে যাওয়ার পরেও তোমার সাথে থাকব।
‎আশুরার দিন তৃষ্ণা. অন্যান্য শিশুদের মতো সাকিনা তিন দিন ধরে তীব্র তৃষ্ণায় ভুগেছিল।সে তার ফুফু যায়নাবকে বারবার জিজ্ঞাসা করছিল,ফুফু!পানি কি এখনও দূরে? বাবা বলেছেন তিনি পানি নিয়ে আসবেন।

‎যখন হযরত আব্বাস পানি আনতে গেলেন, সাকিনা তার ছোট পাত্রটি নিয়ে তাঁর পিছনে দৌড়ে গেল🥹
চাচা!এটাও আমার জন্য ভরে দিন। আব্বাস প্রতিজ্ঞা করলেন,আমি পানি নিয়ে আসব, নাহলে চেষ্টা করতে করতে মরে যাব। তিনি ফিরে আসার আগেই শহীদ হলেন।

‎মাওলা হুসাইনের শাহাদাতের পর,
‎যখন ইমাম হুসাইন নিহত হলেন, সেনাবাহিনী তাঁবুগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিল। সাকিনা ঘুমিয়ে ছিলেন। তাঁর কানের দুল এত জোরে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল যে তাঁর কানের লতি ছিঁড়ে গিয়েছিল তিনি খালি পায়ে মরুভূমিতে দৌড়াতে দৌড়াতে কাঁদছিলেন, বাবা! বাবা!

শামের বন্দী,
‎কারবালার পর,সাকিনাকে বিবি জয়নাব এবং অন্যান্য মহিলাদের সাথে বন্দী হিসেবে কুফায়, তারপর দামেস্কে নিয়ে যাওয়া হয়। ইয়াজিদের দরবারে তিনি ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত এবং খালি মাথায় দাঁড়িয়ে থাকতেন। শামের কারাগারে তিনি প্রতি রাতে কাঁদতেন,আমি আমার বাবাকে চাই। আমার বাবা কোথায়? তিনি খেতেনও না, ঘুমাতেনও না। অন্য বন্দীরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সে শুধু হুসাইনকেই চেয়েছিল।

‎শেষ সাক্ষাৎ ও শাহাদাত ‎শামের অন্ধকার কারাগারে এক রাতে সাকিনা কাঁদতে কাঁদতে জেগে উঠল,বাবা এসেছেন! আমি বাবাকে দেখেছি! সে তাঁর ঠোঁট ও গালে চুম্বন করল, তারপর তাঁর মাথায় নিজের মাথা রাখল এবং আর তা তুলল না। বিবি জয়নাব যখন তাকে সরানোর চেষ্টা করলেন, ততক্ষণে সাকিনা তার বাবার মাথার উপরেই মারা গেছে।তার বয়স ছিল ৪ বছর।

বিবি সাকিনা কেন স্মরণীয় ‎মাজলুম-এ-শাম তাঁর মৃত্যু ইয়াজিদের নিষ্ঠুরতা তুলে ধরে। এমনকি চার বছরের একটি শিশুকেও রেহাই দেওয়া হয়নি। ‎কারবালার সন্তানদের প্রতীক তিনি হুসাইনের সন্তানদের সমস্ত কষ্টের প্রতিনিধিত্ব করেন। বাবার লাডো হুসাইন (আঃ) এর প্রতি তাঁর ভালোবাসা পিতা-কন্যা সম্পর্কের বন্ধন প্রকাশ করে।তাঁর রওজা সিরিয়ার দামেস্কে রয়েছে, মায়েরা তাদের মেয়েদের সেখানে নিয়ে আসেন এবং প্রার্থনা করেন, বিবি আমাদের মেয়েদের তোমার ধৈর্য দাও। সালাম ইয়া বিবি সাকিনা আঃ সেই ছোট্ট রাজকন্যা, যে তার বাবার নাম মুখে নিয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

কারবালার যুদ্ধে মাওলা আবুল ফজল আব্বাস আলামদার (আঃ)-এর শাহাদাত

আপডেট সময় : ০৫:২৪:২৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

নিজস্ব প্রতিনিধি :

মাওলা আব্বাস সম্পর্কে মাওলা আলী (আঃ) সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন এই হচ্ছে আব্বাস, হাশেমী বংশের চাঁদ। যতক্ষণ আব্বাস জীবিত ছিলেন, ততক্ষণ কারবালায় যুদ্ধ চলছিল। আব্বাস জমিনে পড়ে গেলেন, আর তারপর থেকেই কারবালার বুকে জুলুম শুরু হলো। সৈয়দদের কত বড় ভরসা ছিল গাজীর ওপর আলীর কন্যাদের পরম আস্থা ছিল এই বাহুদ্বয়ের ওপর।

কারবালার যুদ্ধ তখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। একে একে মাওলা হুসাইন (আঃ)-এর বিশ্বস্ত সঙ্গীরা ময়দানে গিয়ে শাহাদাত বরণ করছিলেন। প্রতিবার কোনো শহীদের লাশ তাঁবুতে আনা হলে, আব্বাস (আঃ) মাওলা হুসাইনের কাছে এসে বলতেন আকা এবার আমাকে যাওয়ার অনুমতি দিন। আমার হৃদয় সংকুচিত হয়ে আসছে এবং জীবন থেকে আমি তৃপ্তি লাভ করেছি। আমি মুনাফিকদের ওপর আমার ভাইদের রক্তের প্রতিশোধ নিতে চাই। কিন্তু প্রতিবারই মাওলা হুসাইন (আঃ) তাঁকে শান্ত করে বলতেন_”না” আব্বাস তুমি আমার লশকরদের পতাকাবাহক। তুমি চলে গেলে আমার সৈন্যদল ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবে। তুমি আমার ডান হাত, আমার ভরসা।

একে একে মাওলা হুসাইন (আঃ)-এর বিশ্বস্ত সঙ্গীরা ময়দানে গিয়ে শাহাদাত বরণ করছিলেন। আউন (আঃ) ও মুহাম্মদ (আঃ) বিদায় নিলেন। কাসিম (আঃ) ময়দানে গেলেন এবং তাঁর দেহ ঘোড়ার খুরে পিষ্ট হয়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। এ দৃশ্য দেখে আব্বাস (আঃ) অত্যন্ত অস্থির হয়ে পড়লেন। বারবার তিনি মাওলা হুসাইন (আঃ)-এর তাঁবুর দিকে যাচ্ছিলেন আর ফিরে আসছিলেন। কীভাবে তিনি আকাকে রাজি করাবেন, সেই চিন্তায় আব্বাসের হৃদয় ব্যাকুল হয়ে উঠছিল। ঠিক তখনই ছোট্ট বিবি সকিনা (সাঃ আঃ) তাঁর শুকনো মশকটি হাতে নিয়ে চাচা আব্বাসের কাছে এলেন চাচা আব্বাস, আমার মশকটা দেখুন। আমি খুব পিপাসার্ত, প্রিয় চাচা।

মাসুম বিবি সকিনার (সাঃ আঃ) কথা শুনে আব্বাস (আঃ) ইমামের দরবারে যাওয়ার একটি অসিলা খুঁজে পেলেন। তিনি ছোট্ট সকিনাকে কোলে তুলে নিয়ে মাওলা হুসাইন (আঃ)-এর তাঁবুতে প্রবেশ করলেন এবং ইমামের সামনে বসে পড়লেন। আব্বাস (আঃ)-কে নিজের মুখে কিছুই বলতে হলো না। ​মাওলা হুসাইন (আঃ) প্রথমে আব্বাসের দিকে তাকালেন, তারপর সকিনার দিকে এবং সবশেষে তাঁর শুকনো মশকের দিকে। তিনি ভাইয়ের মনের আকুতি সব বুঝে গেলেন।

মাওলা বললেন আব্বাস, এখন আমি তোমাকে কীভাবে না বলি? তুমি সকিনাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছ। যাও, আব্বাস, যাও; সকিনার মশক পানি দিয়ে ভরে নিয়ে এসো। তবে আমার একটি অনুরোধ তোমার তলোয়ারটি আমার কাছে রেখে যাও। আব্বাস কেঁদে বললেন, তলোয়ারটাই যদি আকা আপনাকে দিয়ে যেতে হয়, তবে আমি লড়ব কীভাবে? মাওলা হুসাইন বললেন, তোমাকে লড়ার জন্য পাঠাচ্ছি না, মনে রেখো, তুমি যুদ্ধ করতে যাচ্ছ না, শুধু সাকিনা ও বাচ্চাদের জন্য পানি আনতে যাচ্ছ।

মাওলা আব্বাস (আঃ) তাকিয়ে বললেন, আকা তলোয়ার আমার হাতেই থাকতে দিন। আমি ওয়াদা করছি যে আমি যুদ্ধ করবো না। তখন ​মাওলা হুসাইন (আঃ) তলোয়ারটি নিজের হাতে নিলেন এবং বললেন:

আব্বাস, তুমি যদি তলোয়ার নিয়ে যেতে চাও, তবে এই নাও। ওদের যত পারো মারো, যত পারো দৌড় করাও। কিন্তু আমি ইমাম হিসেবে তোমাকে বলছি যত আঘাত তুমি আজ ইয়াজিদ বাহিনীকে করবে, তার বদলা পরবর্তীতে আমার জয়নবকে (সাঃ আঃ) দিতে হবে, তার বদলা আমার সাকিনাকে (সাঃ আঃ) দিতে হবে আব্বাস, তোমাকে আজ ওদের দৌড় করাতে হবে, কারণ পরবর্তীতে ওরা কখনও উটের সামনে সাকিনাকে, কখনও ঘোড়ার সামনে সাকিনাকে নির্মমভাবে দৌড় করাবে। এ কথা শুনে আব্বাস তলোয়ার বালির ওপর ছুঁড়ে ফেললেন এবং কেঁদে বললেন, আকা আমাকে আগে কেন বলেননি যে এর বদলা আমার মজলুম বোনদের দিতে হবে। আব্বাস (আঃ) তাঁর প্রিয় তলোয়ারটি ইমামের কাছে দিয়ে দিলেন এবং সকিনাকে চুম্বন করে মাটিতে নামিয়ে বললেন সকিনা, আমার জন্য দোয়া করো।

সাইয়্যেদা বিবি জয়নাব (সাঃআঃ) মাওলা আব্বাস (আঃ)-এর চেয়ে প্রায় ২২ বছরের বড় ছিলেন। ছোট ভাই আব্বাসকে তিনি নিজের সন্তানের মতো, স্নেহ করতেন। কারবালার সেই বিদায়ের মুহূর্তে বিবি জয়নাব (সাঃ আঃ) ব্যাকুল হয়ে আব্বাসকে কাছে ডাকলেন এবং নিজের দুই হাত তুলে ভাইয়ের গলা জড়িয়ে ধরলেন। জয়নাব (সাঃআঃ) আব্বাসকে বুকে চেপে ধরে অশ্রুসিক্ত নয়নে কারবালার মাটিতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন:

ভাই আব্বাস, বাবা মাওলা আলী (আঃ) আমাকে বলেছিলেন একদিন কুফা ও শামের শহরে আমাকে বন্দী করা হবে, আমার মাথা থেকে হিজাব ছিনিয়ে নেওয়া হবে। বাবার কথা চিরসত্য, তাই আমার বিশ্বাস ছিল আমার সাথে এটি অবশ্যই ঘটবে। কিন্তু ভাই, আমি এক চিন্তায় ছিলাম আমি ভাবতাম, কার এত বড় দুঃসাহস আর কার এমন বুকের পাটা হবে যে, আমার গাজী আব্বাসের মতো ভাই থাকতে আমাকে বন্দী করবে? কে আমার মাথা থেকে চাদর ছিনিয়ে নেবে? কিন্তু ভাই আব্বাস, আজ কারবালার এই ময়দানে তুমি যখন তলোয়ার ছাড়া ফোরাতের দিকে যাচ্ছ, তখন আমার বিশ্বাস, আমার হিজাব লুট হতে আর দেরি নেই। কুফা ও শামের শহরে বন্দী হিসেবে আমাকে ঘুরানো হবে বাজারে বাজারে।

মাওলা আব্বাস যখন ময়দানে যাচ্ছিলেন, মাওলা হুসাইন (আঃ) তাঁর পিছু পিছু চললেন। হুসাইনের কণ্ঠ শোনা গেল, ভাই আব্বাস, তুমি কি যাচ্ছ? হ্যাঁ মাওলা আমি যাচ্ছি। তলোয়ার ছাড়াই আব্বাসের ঘোড়া ফোরাতের দিকে ছুটে চলল। এক হাতে হুসাইনি ইসলামের পবিত্র আলম, অন্য হাতে বর্শা ও সকিনার মশক। যুদ্ধের জন্য তাঁর কাছে কোনো তলোয়ার ছিল না, কেবল আত্মরক্ষার জন্য ছিল একটি বর্শা। ৪ হাজার শত্রু সৈন্য ফোরাত নদী পাহারা দিচ্ছিল। এসব সৈন্য চারদিক থেকে উনাকে ঘেরাও করে তীর ছুড়তে লাগল। কিন্তু মাওলা আলী (আঃ)-এর পুত্র একাই অসংখ্য এজিদ বাহিনীকে হত্যা করে তাদেরকে দুভাগ করে ফেললেন। তিনি সা’দের সৈন্যবাহিনীর প্রাণকেন্দ্র বরাবর অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখে ফোরাতের শাখায় গিয়ে পৌঁছালেন।

অতল জলের তীরে দাঁড়িয়ে মারাত্মক তৃষ্ণার্ত থাকা সত্ত্বেও, আকা হোসাইন (আঃ) বিবি সকিনা (সাঃ) এবং তাঁবুর নিষ্পাপ শিশুদের কথা স্মরণ করে আনুগত্যের নিদর্শন হিসেবে তিনি এক ফোঁটা পানিও পান করলেন না। তিনি দু’হাতে তোলা পানি আবার নদীতে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন তাঁর ইমাম ও শিশুরা তৃষ্ণার্ত থাকা অবস্থায় তিনি নিজে পানি পান করতে পারেন না। ​তিনি মশকটি পূর্ণ করে যখন তিনি তাঁর বিশ্বস্ত ঘোড়াকে পানি পান করাতে চাইলেন। কিন্তু ঘোড়াটি যেন হুসাইনের শিবিরের দিকে মুখ ফিরিয়ে ইশারায় বলছিল মালিক, সকিনা ও ইমাম যেখানে পিপাসায় কাতর, সেখানে আমি কীভাবে পানি পান করি? আগে তাঁদের কাছে পানি পৌঁছে যাক। আব্বাস (আঃ) এক হাতে পতাকা এবং অন্য হাতে বর্শা ও পানিভর্তি মশক নিয়ে শিবিরের দিকে ফিরে চললেন।

ওদিকে তখন তাঁবু থেকে মাসুম বিবি সকিনার (সাঃ আঃ) জবানীতে রণাঙ্গনের খবর আসছিল: বাবা, আমার চাচা ময়দানে যাচ্ছেন। হুসাইন বললেন, মারহাবা। বাবা, আমার চাচা মাকতালে পৌঁছে গেছেন।হুসাইন বললেন, মারহাবা মা উম্মুল বানিনের সন্তান। বাবা, আমার চাচার ঘোড়া ফোরাত নদীতে নেমে গেছে। বাবা, ফোরাতের ঘাট খালি হয়ে গেছে। বাবা, আমার চাচা মশক ভরে নিয়েছেন বাবা, আমি কি আপনাকে বলিনি? আমার চাচা ময়দানে গেলে পানি নিয়ে আসবেন। ​একথা শুনে মাওলা হুসাইন (আঃ) ব্যথায় কপাল চাপড়ে বালি মাথায় দিলেন এবং বললেন, দোয়া করো এবার যেন পানি নিয়ে আসতে পারেন। ​ওদিকে আবার সকিনার আওয়াজ এল,ঐ দেখুন বাবা, চাচার ঘোড়া ফোরাত থেকে বের হয়ে এসেছে। চাচার ঘোড়া তাঁবুর দিকে আসছে। এই বলতে বলতে সকিনা বালির ওপর পড়ে গেলেন এবং কেঁদে বলতে লাগলেন, বাবা, সৈন্যরা চাচাকে ঘিরে ফেলেছে বাবা, চারপাশ থেকে লশকর এসে গেছে। মাওলা হুসাইন (আঃ) কোমরে হাত দিয়ে বসে পড়লেন। সকিনার আর্তনাদ শোনা গেল, বাবা, চাচার ডান হাত কেটে পড়ে গেছে। হুসাইন উপুড় হয়ে বালির ওপর লুটিয়ে পড়লেন এবং কেঁদে বলতে লাগলেন, হায় ফাতেমা জহুরা (সাঃ আঃ) সকিনার শেষ আওয়াজ এল, বাবা, আমার চাচার দ্বিতীয় হাতটিও কেটে পড়ে গেছে, হুসাইনের বুক চিরে আওয়াজ এল, হায় অসহায়ত্ব।

উমর ইবনে সা’দ তার লশকরদের নির্দেশ দিল আব্বাসকে এই পানি নিয়ে তাঁবুতে ফিরতে দিও না আব্বাস পানি নিয়ে ফিরলে সন্ধ্যা নাগাদ ওদের পরাজিত করা যাবে না। পাষাণ শত্রুরা চারদিক থেকে মওলা আব্বাসকে অবরুদ্ধ করে ফেলল। সবদিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে তীর বর্ষিত হতে লাগল।

এখানে ইতিহাসের সেই নির্মম সত্যটি উন্মোচিত হয় মাওলা আব্বাসের দুই হাত এক সময়ে কাটা পড়েনি। শত্রুরা একযোগে তাঁর সামনে আসার সাহস পায়নি তারা কাপুরুষের মতো জঙ্গল ও খেজুর বাগানের আড়াল থেকে ওত পেতে আক্রমণ করেছিল। প্রথমে জুরার বিন মুররাহ নামক এক অভিশপ্ত সৈন্য পেছন থেকে তরবারির আঘাত করে মাওলা আব্বাসের ডান বাহুটি বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ডান হাত হারিয়েও আব্বাস (আঃ) দমে যাননি, তিনি মশকটি বাম হাতে তুলে নেন এবং যাত্রা অব্যাহত রাখেন। এরপর হাকিম বিন তুফাইল নামক আরেক পাপিষ্ঠ পেছন থেকে আক্রমণ করে তাঁর বাম বাহুটিও কেটে ফেলে। ইসলামের পবিত্র আলাম মাটিতে পড়ে যায়।

দুই বাহু হারিয়েও আব্বাস (আঃ) ঘোড়ার পিঠে থেকে কেবল দাঁতের মধ্যে চেপে ধরে রইলেন সকিনার মশক তবুও তাঁর অন্তরের একমাত্র চিন্তা এই পানি যেকোনো মূল্যে সকিনার কাছে পৌঁছাতেই হবে। তাঁর বিশ্বস্ত ঘোড়াটিও যেন পানি না খেয়ে সকিনার তৃষ্ণার প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করছিল।

মশকটি তখনও পানিতে পূর্ণ ছিল। ঠিক সেই সময় এক অভিশপ্ত তীরন্দাজ তীর ছুঁড়ল। তীরটি সরাসরি এসে মশকে বিদ্ধ হলো এবং সমস্ত পানি কারবালার তপ্ত বালুর বুকে ঝরে পড়ে গেল মশক থেকে পানি বেরিয়ে যেতে দেখে আব্বাস (আঃ) যেন তাঁর জীবনের সমস্ত আত্মিক শক্তি হারিয়ে ফেললেন। তাঁর মনে হলো, তিনি সকিনার কাছে করা ওয়াদা রক্ষা করতে পারলেন না। এরপর আরেকটি নির্মম তীর সরাসরি এসে তাঁর পবিত্র চোখে বিদ্ধ হলো এবং বনি তামিম গোত্রের এক সওয়ারি ভারী লোহার গুর্জ হাতুড়ি জাতীয় অস্ত্র দিয়ে তাঁর মাথায় প্রচণ্ড আঘাত করল। হাত না থাকায় মাটিতে ভর দেওয়ার কোনো উপায় ছিল না মাওলা আলীর সিংহপুত্র রক্তাক্ত দেহে ঘোড়ার পিঠ থেকে সরাসরি তপ্ত জমিনে আছড়ে পড়লেন।

জমিনে পড়েই যন্ত্রণাকাতর কণ্ঠে, পরম ভক্তিতে মাওলা আব্বাস কারবালার ধুলোবালি থেকে উচ্চস্বরে বলে উঠলেন, হে আবা আবদিল্লাহ আপনার এই হাতহীন গোলামের শেষ সালাম গ্রহণ করুন আকা জলদি আসুন আপনার আব্বাস আর পারছে না, ভাইয়ের এই বুকফাটা শেষ আকুতি যখন মাওলা হুসাইন (আঃ)-এর কানে পৌঁছাল, তখন মাওলার মনে হলো যেন আকাশটি তাঁর মাথায় ভেঙে পড়েছে। তিনি দুই হাত দিয়ে নিজের কোমর চেপে ধরলেন এবং বিলাপ করে চিৎকার করে বললেন, হে আব্বাস আজ আমার মেরুদণ্ড ভেঙে গেল?

পাপিষ্ঠ ইয়াজিদ বাহিনী মাওলা হুসাইন পৌঁছানোর আগেই কারবালার মাটিতে আব্বাসের পবিত্র দেহকে নিষ্ঠুরভাবে ছিন্নভিন্ন করে চারদিকে ছড়িয়ে দিয়েছিল তারা কেবল হাত কাটার ওপর ক্ষান্ত হয়নি, বরং মাওলা আলীর সিংহের ওপর তাদের এত ক্ষোভ ও ভয় ছিল যে, কোথাও আব্বাসের হাত ফেলে রেখেছিল, কোথাও আব্বাসের পা কেটে ফেলে রেখেছিল

ভাইয়ের খোঁজে মাওলা হুসাইনের বিশ্বস্ত ঘোড়া জুলজানা ছুটে চলল। কিন্তু কিছুটা দূরে গিয়ে জুলজানা হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। হুসাইন বললেন, জুলজানা, তুমি কি ক্লান্ত হয়ে গেছ? জুলজানা নিজের কাঁপতে থাকা শরীর নিয়ে মাথা নিচু করে তার খুর দিয়ে জমিনে ইশারা করল। হুসাইন তাকিয়ে দেখলেন, আব্বাসের কেটে যাওয়া ডান হাতটি রাস্তায় পড়ে আছে হুসাইন ঘোড়ার জিন থেকে জমিনে পড়ে গেলেন এবং ভাইয়ের সেই হাতটি বুকে তুলে কেঁদে বললেন, এর ওপর বোন জয়নবের কত বড় ভরসা ছিল এই বাহুদ্বয়ের ওপর আলীর কন্যাদের কত বড় ভরসা ছিল।

অসহায় হুসাইন কারবালার তপ্ত বালুর বুকে হেঁটে হেঁটে, উথাল-পাথাল কেঁদে কেঁদে বলছিলেন: কেউ কি আছ, যে আমার গাজীর এই ছিন্নভিন্ন অঙ্গগুলো এক জায়গায় জড়ো করে দেবে? কেউ কি আছ, যে আমাকে আমার আব্বাসকে ফিরিয়ে দেবে?

হুসাইন যখন ঘাতকদের ভীড়ে আব্বাসের কাছে পৌঁছালেন, দেখলেন শরীরের সব জায়গায় জখম, গুর্জের আঘাতে মাথা চৌচির, কিন্তু তখনও মুখ থেকে মশক ছাড়েননি। হুসাইন আব্বাসের মাথা মোবারক নিজের কোলে তুলে নিলেন। আব্বাস (আঃ) বললেন আকা, হাত দুটোও নেই যে রক্ত মুছে আপনাকে একনজর দেখব। ছোটবেলায় আম্মাজানের মুখে শুনেছিলাম, দুনিয়ায় এসে আমি সর্বপ্রথম আপনার চেহারা মোবারক দেখেছিলাম। আজ বিদায় নেওয়ার আগেও আপনার চেহারা দেখে মরতে চাই। কিন্তু এক চোখে তীর বিদ্ধ, অন্য চোখ রক্তে রঞ্জিত।

মাওলা হুসাইন (আঃ) নিজ হাতে ভাইয়ের চোখ থেকে জমাট বাঁধা রক্ত মুছে দিলেন। আব্বাস (আঃ) পরম ভালোবাসা ভরা দৃষ্টিতে ইমামের দিকে তাকালেন। মাওলা হোসেন বললেন আব্বাস, সারা জীবন তুমি আমাকে আকা বলে ডেকেছ। তোমার মুখ থেকে ভাই ডাক শোনার জন্য ব্যাকুল থাকতাম। শেষবারের মতো আমাকে একবার ভাই বলে সম্বোধন করো।

আব্বাস (আঃ) অশ্রুসিক্ত নয়নে বললেন, ইবনে রাসুলিল্লাহ হুসাইন, আমার ভাই আমার এই ক্ষতবিক্ষত দেহ তাঁবুতে নিয়ে যাবেন না। আমি বড় লজ্জিত, ভাই আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েও সকিনাকে পানি দিতে পারিনি, খালি হাতে আমি তাকে মুখ দেখাতে পারব না। এরপর মাওলা আব্বাস (আঃ) হুসাইন (আঃ)-এর কোলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে শাহাদাতের পেয়ালা পান করলেন। মাওলা হোসেন (আঃ) তাঁর মস্তক মোবারক বুকে চেপে ধরে চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন, আব্বাস তোমার মৃত্যুতে আজ আমার মেরুদণ্ড ভেঙে গেল, আজ আমার সমস্ত শক্তি শেষ হয়ে গেল, আমার ভরসা চলে গেল, আমার আলামদার চলে গেল।

মাওলা হুসাইন (আঃ) একা হাতে ভূমিতে পড়ে থাকা রক্তমাখা পতাকাটি তুলে নিলেন এবং শূন্য, খালি মশকটি তাতে বেঁধে নিলেন। দূর শিবিরে দাঁড়িয়ে মাসুম সকিনা (সাঃ আঃ) দূর থেকে শুধু পতাকাটি আসতে দেখতে পেলেন। তিনি আনন্দে চিৎকার করে বাকি শিশুদের ডেকে বললেন বাচ্চারা এসো, জলদি এসো আমার চাচা আব্বাস পানি নিয়ে আসছেন। আমি তোমাদের সবাইকে পানি দেব। এসো, সবাই মশক নিয়ে এসো? সকিনা (সাঃ আঃ) যখন শিশুদের নিয়ে মশক হাতে আনন্দের সাথে অপেক্ষা করছিলেন, তখনই কারবালার তপ্ত বাতাস স্তব্ধ হয়ে গেল।

মাওলা হুসাইন (আঃ) যখন শূন্য হাতে তাঁবুর কাছে পৌঁছালেন, তিনি অত্যন্ত ক্লান্ত ও ভগ্নস্বরে ডেকে উঠলেন
জয়নব?(সাঃআঃ) জয়নব?(সাঃআঃ) আমাকে সাহায্য করো কারবালার পতাকা ফিরে এসেছে কিন্তু পতাকাবাহক আর ফিরে আসেনি। ফোরাতের তীর থেকে হায়দারের বীর হৃদয় আর ফিরে আসেনি।

চাচা আব্বাসের শাহাদাতের এই খবর শুনে সকিনা (সাঃ আঃ)-এর হাতের ছোট্ট মশকটি বালুর বুকে খসে পড়ল। তিনি আর সইতে পারলেন না, চাচার বিরহে কাঁদতে কাঁদতে তপ্ত বালুর ওপরই অচেতন হয়ে গেলেন। অচেতন হয়ে যাওয়ার পর সকিনা (সাঃ আঃ) এক করুণ স্বপ্ন দর্শন করলেন। তিনি স্বপ্নে দেখলেন, তাঁর চাচা গাজী আব্বাস (আঃ) নূরানী বেশে তাঁর সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু স্বপ্নের মধ্যেও চাচার সেই দুই পবিত্র বাহু নেই? সকিনা (সাঃ আঃ) স্বপ্নে চাচার সেই অবয়ব দেখে কেঁদে কেঁদে জড়িয়ে ধরতে চাইলেন, কিন্তু হাত না থাকায় চাচা আব্বাস তাকে বুকে টেনে নিতে পারলেন না। সকিনা (সাঃ আঃ) স্বপ্নে আর্তনাদ করে বললেন:

চাচাজান আপনি কোথায় চলে গেলেন? আমার আব্বাস চাচা আমি আর কখনো আপনার কাছে পানি চাইব না। আমার আর পানির তৃষ্ণা নেই, চাচা আপনি শুধু তাঁবুতে ফিরে আসুন। আপনি ছাড়া যে আমাদের আর কোনো ভরসা নেই। দেখুন, পাপিষ্ঠরা আমাদের তাঁবুর চারপাশ ঘেরাও করে ফেলেছে। স্বপ্নের মাঝেই চাচা আব্বাসের চোখ থেকে অশ্রু ঝরে পড়ল। তিনি বললেন, মা সকিনা তোমার চাচা লজ্জিত। শত্রুরা আমার দুই হাত কেটে ফেলেছে, নয়তো আব্বাস বেঁচে থাকতে আমার সকিনা তৃষ্ণার্ত থাকত না।

যখন বিবি সকিনা (সাঃ আঃ) এর চোখ খুলল, তিনি নিজেকে ফুফু আম্মাজান জয়নব (সাঃ আঃ)-এর কোলে দেখতে পেলেন। ফোরাতের পানির তৃষ্ণা আর চাচার ফিরে আসার আশা সবকিছু কারবালার বুকে চিরতরে বিলীন হয়ে গেল। সেই রাত থেকেই শুরু হলো আলীর কন্যাদের ওপর এজিদ বাহিনীর নির্মম জুলুম ও তাবু জ্বালিয়ে দেওয়ার তাণ্ডব।

সংক্ষিপ্ত কারবালার বিবরণ:

বিবি সাকিনা ছিলেন – বিবি সাকিনা, যার আসল নাম ফাতিমা কুবরা, ছিলেন ইমাম হুসাইন (আঃ)এবং বিবি রুবাবের আদরের কন্যা। কারবালার সময় তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৩ থেকে ৪ বছর। তাঁর বাবা তাঁকে সাকিনা বলে ডাকতেন, যার অর্থ শান্তি/স্থিরতা, কারণ তাঁর উপস্থিতি তাঁকে শান্তি দিত। তিনি ইমাম হুসাইনের প্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত ছিলেন।

‎‎‎মহররমের ৯ তারিখ রাতে,যখন ইমাম হুসাইন আঃ তাঁর পরিবারকে বললেন যে শাহাদাত বরণ নিশ্চিত, তখন ছোট্ট সাকিনা কাঁদতে শুরু করল।তিনি তার বাবার পা জড়িয়ে ধরে বললো,বাবা!তুমি কি আমাদের একা ছেড়ে যাবে? তোমার পরে আমাদের কে থাকবে? ‎হুসাইন (আঃ) তাকে তুলে নিলেন,তার চোখের জল মুছে দিলেন এবং বললেন,আমার সাকিনা,তোমার বাবা তোমাকে ছেড়ে যাচ্ছেন না। আমি চলে যাওয়ার পরেও তোমার সাথে থাকব।
‎আশুরার দিন তৃষ্ণা. অন্যান্য শিশুদের মতো সাকিনা তিন দিন ধরে তীব্র তৃষ্ণায় ভুগেছিল।সে তার ফুফু যায়নাবকে বারবার জিজ্ঞাসা করছিল,ফুফু!পানি কি এখনও দূরে? বাবা বলেছেন তিনি পানি নিয়ে আসবেন।

‎যখন হযরত আব্বাস পানি আনতে গেলেন, সাকিনা তার ছোট পাত্রটি নিয়ে তাঁর পিছনে দৌড়ে গেল🥹
চাচা!এটাও আমার জন্য ভরে দিন। আব্বাস প্রতিজ্ঞা করলেন,আমি পানি নিয়ে আসব, নাহলে চেষ্টা করতে করতে মরে যাব। তিনি ফিরে আসার আগেই শহীদ হলেন।

‎মাওলা হুসাইনের শাহাদাতের পর,
‎যখন ইমাম হুসাইন নিহত হলেন, সেনাবাহিনী তাঁবুগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিল। সাকিনা ঘুমিয়ে ছিলেন। তাঁর কানের দুল এত জোরে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল যে তাঁর কানের লতি ছিঁড়ে গিয়েছিল তিনি খালি পায়ে মরুভূমিতে দৌড়াতে দৌড়াতে কাঁদছিলেন, বাবা! বাবা!

শামের বন্দী,
‎কারবালার পর,সাকিনাকে বিবি জয়নাব এবং অন্যান্য মহিলাদের সাথে বন্দী হিসেবে কুফায়, তারপর দামেস্কে নিয়ে যাওয়া হয়। ইয়াজিদের দরবারে তিনি ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত এবং খালি মাথায় দাঁড়িয়ে থাকতেন। শামের কারাগারে তিনি প্রতি রাতে কাঁদতেন,আমি আমার বাবাকে চাই। আমার বাবা কোথায়? তিনি খেতেনও না, ঘুমাতেনও না। অন্য বন্দীরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সে শুধু হুসাইনকেই চেয়েছিল।

‎শেষ সাক্ষাৎ ও শাহাদাত ‎শামের অন্ধকার কারাগারে এক রাতে সাকিনা কাঁদতে কাঁদতে জেগে উঠল,বাবা এসেছেন! আমি বাবাকে দেখেছি! সে তাঁর ঠোঁট ও গালে চুম্বন করল, তারপর তাঁর মাথায় নিজের মাথা রাখল এবং আর তা তুলল না। বিবি জয়নাব যখন তাকে সরানোর চেষ্টা করলেন, ততক্ষণে সাকিনা তার বাবার মাথার উপরেই মারা গেছে।তার বয়স ছিল ৪ বছর।

বিবি সাকিনা কেন স্মরণীয় ‎মাজলুম-এ-শাম তাঁর মৃত্যু ইয়াজিদের নিষ্ঠুরতা তুলে ধরে। এমনকি চার বছরের একটি শিশুকেও রেহাই দেওয়া হয়নি। ‎কারবালার সন্তানদের প্রতীক তিনি হুসাইনের সন্তানদের সমস্ত কষ্টের প্রতিনিধিত্ব করেন। বাবার লাডো হুসাইন (আঃ) এর প্রতি তাঁর ভালোবাসা পিতা-কন্যা সম্পর্কের বন্ধন প্রকাশ করে।তাঁর রওজা সিরিয়ার দামেস্কে রয়েছে, মায়েরা তাদের মেয়েদের সেখানে নিয়ে আসেন এবং প্রার্থনা করেন, বিবি আমাদের মেয়েদের তোমার ধৈর্য দাও। সালাম ইয়া বিবি সাকিনা আঃ সেই ছোট্ট রাজকন্যা, যে তার বাবার নাম মুখে নিয়ে মৃত্যুবরণ করেন।