সিলেট শতকোটি টাকার হাসপাতাল চালু হয়নি তিন বছরেও,শতবর্ষের ঐতিহ্য আবু সিনা ছাত্রাবাস ধ্বং*স
- আপডেট সময় : ০৮:১৪:২৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে
নিজস্ব প্রতিবেদক :
সিলেট নগরীর প্রাণকেন্দ্রে প্রায় শতকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ২৫০ শয্যার ‘সিলেট জেলা হাসপাতাল’ নির্মাণ শেষ হওয়ার তিন বছর পার হলেও এখনো চালু করা যায়নি। ফলে কোটি কোটি টাকার আধুনিক স্থাপনা ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে আছে। দীর্ঘ সময় ধরে হাসপাতালটি বন্ধ থাকায় জনমনে ক্ষোভ, হতাশা ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এই হাসপাতাল নির্মাণের আগে থেকেই বিষয়টি নিয়ে সিলেটজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক ছিল। কারণ হাসপাতালটি নির্মাণের জন্য ভেঙে ফেলা হয় শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা; আবু হেনা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল, যা স্থাপত্যকলার একটি অনন্য নিদর্শন হিসেবে পরিচিত ছিল। পুরাতন মেডিকেল এলাকার এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ভেঙে সেখানে ১৫ তলা বিশিষ্ট একটি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে।
এই সিদ্ধান্তের শুরু থেকেই তীব্র বিরোধিতা করেন সিলেটের সুশীল সমাজ, স্থাপত্যবিদ, ঐতিহ্যপ্রেমী মানুষ ও বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন। তাদের যুক্তি ছিল, হাসপাতাল নির্মাণের জন্য শহরের এই জায়গাটি উপযুক্ত নয়। কারণ মাত্র প্রায় ৫০ গজ দূরত্বে রয়েছে শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতাল এবং ৫০০ গজের মধ্যেই অবস্থিত সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এত কাছাকাছি তিনটি হাসপাতাল থাকার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তখন থেকেই প্রশ্ন উঠেছিল।
সমালোচকদের মতে, শহরের মধ্যস্থলে নতুন হাসপাতাল নির্মাণের পরিবর্তে শহরতলিতে এটি নির্মাণ করা হলে নগরীর যানজট কমানো সম্ভব হতো। একই সঙ্গে শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটিও সংরক্ষণ করা যেত। এছাড়া হাসপাতালটির পাশেই রয়েছে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠ, যেখানে নিয়মিত রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, খেলাধুলা, মেলা ও ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এ ধরনের পরিবেশ হাসপাতালের জন্য উপযোগী নয় বলেও তখন মত দিয়েছিলেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।
কিন্তু এসব আপত্তি সত্ত্বেও প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া বন্ধ হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও কিছু স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের প্রভাব এবং কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগের মধ্যেই প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়া হয়। ফলে সুশীল সমাজের প্রতিবাদ উপেক্ষা করেই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি ভেঙে ফেলা হয় এবং হাসপাতাল নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়।
২০১৯ সালের জানুয়ারিতে প্রায় ৬ দশমিক ৯৮ একর জমির ওপর হাসপাতালটির নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। সে সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন। গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পদ্মা অ্যাসোসিয়েশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড হাসপাতাল ভবনের নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী হাসপাতালটি ১৫ তলা বিশিষ্ট হওয়ার কথা ছিল। তবে প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ে আটতলা পর্যন্ত নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হয়। ২০২৩ সালে ভবনের নির্মাণকাজ শেষ করে উদ্বোধনের জন্য প্রস্তুত করা হয়।
কিন্তু এখানেই শুরু হয় নতুন জটিলতা। হাসপাতালটি পরিচালনার দায়িত্ব নিতে স্থানীয় কোনো স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষই আগ্রহ দেখায়নি। সিভিল সার্জন কার্যালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালকের অফিস এবং সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কেউই ভবনটির দায়িত্ব নিতে রাজি হয়নি।
তাদের অভিযোগ, হাসপাতালটি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের উপযোগী করে পরিকল্পনা করা হয়নি। নির্মাণের সময় স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে কোনো ধরনের সমন্বয় করা হয়নি। ফলে হাসপাতালের জন্য প্রয়োজনীয় কক্ষের সংখ্যা, আয়তন, বিভাগীয় বিন্যাসসহ অনেক বিষয়ই মানসম্মতভাবে করা হয়নি।
এ কারণে নির্মাণ শেষ হওয়ার তিন বছর পার হলেও হাসপাতালটি চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে নগরীর কেন্দ্রস্থলে কোটি কোটি টাকার আধুনিক অবকাঠামো কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
গত বছরের ২ অক্টোবর হাসপাতালটি পরিদর্শনে যান গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব নজরুল ইসলাম এবং সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম। পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসক ঘোষণা দেন, সব জটিলতা কাটিয়ে আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যেই হাসপাতালটির কার্যক্রম চালু করা হবে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন, হাসপাতালটি চালু হলে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। কিন্তু সেই ঘোষণার চার মাস পার হলেও হাসপাতাল চালুর কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। স্থানীয় প্রশাসন কিংবা স্বাস্থ্য বিভাগের কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না কবে নাগাদ হাসপাতালটির কার্যক্রম শুরু হবে।
গণপূর্ত বিভাগের তথ্যমতে, হাসপাতাল ভবনের বেজমেন্টে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রথম তলায় টিকিট কাউন্টার ও রোগীদের জন্য অপেক্ষমাণ কক্ষ রয়েছে। দ্বিতীয় তলায় আউটডোর বিভাগ, রিপোর্ট ডেলিভারি সেকশন এবং কনসালট্যান্টদের চেম্বার রাখা হয়েছে।
তৃতীয় তলায় ডায়াগনস্টিক বিভাগ এবং চতুর্থ তলায় কার্ডিয়াক ও জেনারেল অপারেশন থিয়েটার, আইসিসিইউ ও সিসিইউ স্থাপন করা হয়েছে। পঞ্চম তলায় গাইনি বিভাগ, চক্ষু বিভাগ, অর্থোপেডিক্স এবং নাক-কান-গলা বিভাগের জন্য আলাদা ইউনিট রাখা হয়েছে। ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম তলায় রোগীদের জন্য ওয়ার্ড ও কেবিনের ব্যবস্থা রয়েছে। হাসপাতালটিতে মোট ১৯টি আইসিইউ বেড, ৯টি সিসিইউ বেড এবং ৪০টি কেবিন রয়েছে। কাগজে-কলমে এসব আধুনিক সুবিধা থাকলেও বাস্তবে হাসপাতালটি এখনো কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক ডা. মো. নাসির উদ্দিন জানান, হাসপাতালটির জন্য একজন সহকারী পরিচালককে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাকে কোনো আর্থিক ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। ফলে তিনি হাসপাতাল পরিচালনা বা তদারকি করতে পারছেন না।
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে অনেক আগেই মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। তার অভিযোগ, হাসপাতাল নির্মাণের সময় স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়নি।
তার মতে, ভবনের কাঠামো ও নকশায় বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। এই অবস্থায় কেউ যদি হাসপাতালের দায়িত্ব নেয়, তাহলে তাকে নানা প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত জটিলতার মুখোমুখি হতে হবে।
সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. জন্মেজয় দত্তও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, হাসপাতালের স্থাপত্য নকশা ও কক্ষের বিন্যাস যথাযথভাবে পরিকল্পনা করা হয়নি। রোগী পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় র্যাম্প, ট্রলি চলাচলের সুবিধা এবং অন্যান্য জরুরি অবকাঠামোগত বিষয় যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
তিনি আরও জানান, হাসপাতালটির এখনো কোনো বাউন্ডারি দেয়াল নেই, যা নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। পাশাপাশি হাসপাতালের জন্য প্রয়োজনীয় ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও এখনো গড়ে তোলা হয়নি।
তার মতে, এসব মৌলিক সুবিধা ছাড়া একটি হাসপাতাল চালু করা সম্ভব নয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পন্ন করার জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও তারা এখনো কাজ শেষ করেনি।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট এমাদ উল্লাহ শহীদুল ইসলাম শাহীন বলেন, এত বড় এবং আধুনিক একটি ভবন বছরের পর বছর পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক।
তিনি বলেন, জনগণের টাকায় নির্মিত এই হাসপাতাল দ্রুত চালু করা না হলে এটি জাতীয় সম্পদের অপচয় হিসেবে বিবেচিত হবে। তাই সব ধরনের ত্রুটি দ্রুত সংশোধন করে হাসপাতালটি চালুর জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদেরও একই দাবি। তাদের মতে, সিলেট অঞ্চলে প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর অতিরিক্ত চাপের কারণে অনেক সময় চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এ অবস্থায় নতুন জেলা হাসপাতালটি চালু হলে রোগীরা সহজে চিকিৎসা সেবা পেতেন এবং বড় হাসপাতালের ওপর চাপও অনেকটা কমে যেত।
স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে এমন অব্যবস্থাপনা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে; পরিকল্পনা ছাড়াই কেন এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলো? কেন স্বাস্থ্য বিভাগের মতামত নেওয়া হয়নি? আর নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও কেন দ্রুত হাসপাতালটি চালু করা হচ্ছে না?
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনিক জটিলতা দ্রুত নিরসন, অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন এবং প্রয়োজনীয় জনবল ও বাজেট নিশ্চিত করা গেলে অল্প সময়ের মধ্যেই হাসপাতালটি চালু করা সম্ভব। সিলেটবাসীর প্রত্যাশা, দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত ২৫০ শয্যার সিলেট জেলা হাসপাতাল চালু করা হবে এবং এটি সিলেট অঞ্চলের মানুষের জন্য একটি কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে।




























