বঙ্গ রাজ্য একটি প্রাচীন রাজ্য ও ভূ-রাজনৈতিক বিভাগ
- আপডেট সময় : ০৭:৪৪:১৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৬ জুলাই ২০২৫ ২৩৬ বার পড়া হয়েছে
উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে :
বঙ্গ ভারতীয় উপমহাদেশের গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ সীমার মধ্যে একটি প্রাচীন রাজ্য ও ভূ-রাজনৈতিক বিভাগ ছিল। রাজ্যটি বাংলা অঞ্চলের অন্যতম নামের একটি। বর্তমানে বাংলার দক্ষিণাংশ এবং পূর্বাংশ জুড়ে রাজ্যটির মূল অঞ্চলটি অবস্থিত ছিল। প্রাচীন ভারতের মহাকাব্য ও গল্পে এবং শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে বঙ্গের উল্লেখ বিশেষভাবে দেখা যায়।
বঙ্গ সম্ভবত গঙ্গারিডাই সাম্রাজ্যের কেন্দ্র ছিল, যা অসংখ্য গ্রিক-রোমান লেখক দ্বারা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাচীন বঙ্গ রাজ্যের সঠিক রাজধানী শনাক্ত করা যায়নি। গুপ্ত সাম্রাজ্যের শাসনের পর, প্রাচীন বাংলা গৌড় ও বঙ্গ নামক দুটি স্বাধীন রাজ্যে বিভক্ত হয়েছিল। প্রত্নতাত্ত্বিকরা মনে করেন, গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর বর্তমান বাংলাদেশের কোটালীপাড়া স্বাধীন বঙ্গ রাজাদের রাজধানী ছিল।
ভারতীয় ও গ্রিক-রোমান লেখকগণ এই অঞ্চলের যোদ্ধা হাতির কথা উল্লেখ করেছেন। ভারতীয় ইতিহাসে, বঙ্গ তার শক্তিশালী নৌবাহিনীর জন্য উল্লেখযোগ্য। হিন্দু মহাকাব্য মহাভারতে বঙ্গের অসংখ্য উল্লেখ রয়েছে, যা ভারতের দুটি প্রধান সংস্কৃত মহাকাব্যের একটি। অন্য মহাকাব্য, রামায়ণ, রাজ্যটিকে অযোধ্যার মিত্র রাজ্য হিসাবে উল্লেখ করেছে।প্রত্নাত্ত্বিক প্রমাণ অনুসারে মৌর্যপূর্ব যুগ থেকে পাল-সেন যুগ পর্যন্ত চন্দ্রকেতুগড় বঙ্গ রাজ্যের একটি অন্যতম প্রধান নগরী ছিল।[১] প্রাচীন জৈন উপাঙ্গে বাংলার প্রাচীন বন্দর নগরী তাম্রলিপ্তকে বঙ্গ রাজ্যের রাজধানী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।[২]
ইতিহাস

(আনু. ১১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ–আনু. ৩৪০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ),(পরবর্তী বৈদিক যুগে বঙ্গ ও অন্যান্য রাজ্যগুলি, আনু. ১১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)
বঙ্গ উত্তর-ভারতীয় কৃষ্ণ চিক্কণ মৃৎপাত্র যুগে নিম্ন গাঙ্গেও ব-দ্বীপে একটি রাজ্য হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। বঙ্গ রাজ্যের অধিবাসীরা নিজের বিশাল নৌবহর দ্বারা ব-দ্বীপে অবস্থিত একাধিক দ্বীপ নিয়ন্ত্রণ এবং বিদেশ যাত্রা করতেন। প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থসমূহে বঙ্গকে নাবিকদের দেশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আনুমানিক ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বঙ্গরাজ সিংহবাহুর পুত্র বিজয় সিংহ ৭০০ সৈন্য নিয়ে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে বর্তমান শ্রীলঙ্কায় পৌঁছান এবং সিংহল নামে একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।[৩] বঙ্গ অতীতে প্রধানত বৈদিক হিন্দুধর্ম, জৈন ধর্ম এবং পরবর্তীতে বৌদ্ধধর্মের পীঠস্থান ছিল।
বঙ্গকে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে শাসনকেন্দ্র বলা হয়েছে। এছাড়াও কালিদাস বঙ্গকে ভারতবর্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং শক্তিশালী নৌশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। একাধিক শিলালিপি এবং গ্রন্থ থেকে বঙ্গের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের নাম জানতে পারা যায়। এদের মধ্যে উপবঙ্গ বিভাগটি বর্তমান যশোর এবং তৎসংলগ্ন জঙ্গলাকীর্ণ সুন্দরবন অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত ছিল। বিক্রমপুরবঙ্গ এবং নাব্যবঙ্গ বা অনুত্তরবঙ্গ নামে আরো দুটি বিভাগের উল্লেখ পাওয়া যায় যা বর্তমানে বৃহত্তর ঢাকা–ফরিদপুর এবং বরিশালকে নির্দেশ করে।[৪]

(প্রাচীন ভারতে বঙ্গ ও পূর্বকালীন প্রতিবেশী)
| রাজধানী | সম্ভবত কোটালীপাড়া (অধুনা গোপালগঞ্জ) |
|---|---|
| প্রচলিত ভাষা | বৈদিক সংস্কৃত |
| ধর্ম | ঐতিহাসিক বৈদিক ধর্ম |
| সরকার | রাজতন্ত্র |
| রাজা (রাজা বা প্রধান) | |
| • আনু. খ্রিস্টপূর্ব দশম শতাব্দী | সমুদ্রসেন |
| • আনু. খ্রিস্টপূর্ব নবম শতাব্দী | Chadrasena |
| ঐতিহাসিক যুগ | লোহার যুগ |
| • প্রতিষ্ঠা | আনু. ১১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ |
| • বিলুপ্ত | আনু. ৩৪০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ |
| পূর্বসূরীউত্তরসূরী | |
| বর্তমানে যার অংশ | বাংলাদেশ ও ভারত |
বঙ্গ রাজ্যের শাসকদের নাম বেশিরভাগই অজানা। আনুমানিক ২০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের পর প্রাচীন বঙ্গ রাজ্য মৌর্য, গুপ্ত, গৌড়, খড়্গ, পাল, চন্দ্র, বর্মণ, সেন এবং দেব সাম্রাজ্যের অংশ হয়। বাঙ্গালা নামটি বৃহৎ বঙ্গকে বোঝাতে প্রায়ই ব্যবহৃত হতো। উদাহরণস্বরূপ, চোল সাম্রাজ্যের একটি শিলালিপিতে চন্দ্র রাজবংশের সঙ্গে যুদ্ধের সময় এই ভূমিকে বাঙ্গালাদেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।[৫] আনুমানিক ৭২০ খ্রিস্টাব্দে মহারাজ আনন্দদেবের কুমিল্লার তাম্রশাসন থেকে জানা যায় তিনি শ্রী বাঙ্গালা মৃগাঙ্ক উপাধি ব্যবহার করতেন, যার অর্থ বাঙ্গালার চন্দ্র।[৬][৭] এছড়াও অষ্টম শতকে রচিত বাংলা সাহিত্য চর্যাগীতিতেও বঙ্গ, বঙ্গালদেশ এবং বঙ্গালী জাতির উল্লেখ পাওয়া যায়। বাংলায় মুসলিম আগ্রাসনের পর এই অঞ্চলকে বাঙ্গালাহ্ নামে অভিহিত করা হয়, যেটা প্রাচীণ বাঙ্গালা শব্দ থেকে এসেছে। এই নামগুলোই আধুনিক বঙ্গ বা বাংলা নামের পূর্বসূরি।

























