ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন
- আপডেট সময় : ০৩:৩১:২২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে
আগামী সপ্তাহেই দিল্লি সফরে যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী
ভিউ নিউজ ৭১ ডেস্ক :
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর ঘিরে বেশ আশাবাদী ভারত। এই ইস্যুতে ঢাকার সঙ্গে জোর আলোচনা চালাচ্ছে নয়াদিল্লি। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে আগামী সপ্তাহের শেষ ভাগে বা সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নয়াদিল্লি যেতে পারেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তার এই সফরকে সামনে রেখে ঢাকা ও নয়াদিল্লি উভয় রাজধানীতেই জোর প্রস্তুতি চলছে বলে দুই দেশের কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়নি। কর্মকর্তারাও নাম প্রকাশ করে কথা বলতে রাজি হননি।
তবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো আজ তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফর নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
এনডিটিভি লিখেছে, সম্ভাব্য এই সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে দুদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এর মধ্যে বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা গুরুত্ব পেতে পারে।
সব ঠিক থাকলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটাই হবে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর। দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এ সফর তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, দুদিনের এই সফরটি একটি দ্বিপক্ষীয় কর্মসূচি হিসেবে সাজানো হচ্ছে। তবে সফরের চূড়ান্ত সময়সূচি এখনও নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তাকে নয়াদিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এছাড়া আগামী সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস আউটরিচ সেশনেও বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত।
মোদি-তারেক প্রথম বৈঠক ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ
প্রতিবেদন বরাতে সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, দিল্লি ও ঢাকা—উভয় পক্ষই নরেন্দ্র মোদি ও তারেক রহমানের মধ্যকার সম্ভাব্য এই প্রথম বৈঠকের দিকে গভীর নজর রাখছে।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারতের পক্ষ থেকেও ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন কৌশলগত সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দেয়। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দুদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। এরপর থেকে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক দাবিসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে দুদেশের মধ্যে মতভিন্নতা তৈরি হয়েছিল।
তবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ভারতের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সম্প্রতি দুদেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনঃস্থাপনেরও কিছু লক্ষণ দেখা গেছে। এর অংশ হিসেবে গত এপ্রিলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান নয়াদিল্লি সফর করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন। এছাড়া গত ১০ আগস্ট ঢাকায় তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী, যেখানে দুদেশের মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়নের উপায় নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রধান ইস্যু: শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে যান এবং এরপর থেকেই তিনি সেখানে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশের একটি ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে দিল্লির কাছে তাকে হস্তান্তরের দাবি জানায়। ভারত অবশ্য জানিয়েছে, এই অনুরোধটি যথাযথ আইনি ও কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
চলতি মাসের শুরুর দিকে শেখ হাসিনা দিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে ভার্চ্যুয়ালি মতবিনিময় করলে এ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানায়, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়া উচিত নয়। তবে ভারত সরকার ওই অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গে কোনো সংশ্লিষ্টতা থাকার কথা অস্বীকার করেছে।
সূত্র জানিয়েছে, ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বৈঠকেও প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গটি উঠে আসে। সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অগ্রগতি ব্যাহত না করে কীভাবে এই বিরোধপূর্ণ ইস্যুটির সমাধান করা যায়, তা নিয়ে উভয় পক্ষকেই পথ খুঁজতে হবে।
পানি, বাণিজ্য ও সীমান্ত সংকট
উভয় দেশের মধ্যে সমাধানের অপেক্ষায় থাকা দীর্ঘদিনের বেশ কিছু বাস্তবভিত্তিক সমস্যাও রয়েছে। আসন্ন আলোচনায় মূলত বাণিজ্য ও ট্রানজিট, জ্বালানি সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘ অভিন্ন সীমান্ত এবং জোরালো অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকায়, রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরি হলে তা দ্রুত এই খাতগুলোতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
আরেকটি বড় ইস্যু হতে পারে অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। ফলে সময় ঘনিয়ে আসায় চুক্তি নবায়নের আলোচনাটি বিশেষ গুরুত্ব পাবে। এছাড়া অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়েও ভারতের কাছ থেকে আরও সহযোগিতা চেয়েছে ঢাকা।
অন্যদিকে, শুধু দীর্ঘ সীমান্তের কারণেই নয়, বরং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ এবং কৌশলগত অবস্থানের কারণেও বাংলাদেশের সঙ্গে একটি স্থিতিশীল ও সুদৃঢ় সম্পর্ক বজায় রাখা নয়াদিল্লির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সম্পর্কের নতুন দিগন্তের পরীক্ষা
সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দুই দেশই যখন তাদের সম্পর্ককে স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে আগ্রহী, ঠিক তখনই এই সফরের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
যদিও বিশ্লেষকদের মতে, এই একটি মাত্র সফরেই অমীমাংসিত সব সংকটের সমাধান হয়ে যাবে এমনটি ভাবা ঠিক হবে না। শেখ হাসিনার ইস্যু, পানিবণ্টন, বাণিজ্য ও সীমান্ত নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনার প্রয়োজন পড়বে। তবে নরেন্দ্র মোদি ও তারেক রহমানের মধ্যে সরাসরি আলোচনা দুই দেশের মতপার্থক্য নিরসনে একটি কার্যকর রাজনৈতিক পথ উন্মোচন করতে পারে।
ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যদি এই সফর হয় তাহলে এর মাধ্যমে তারেক রহমান ঢাকার অবস্থান সরাসরি ভারতের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে তুলে ধরার সুযোগ পাবেন। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্যও এটি বাংলাদেশের নতুন সরকারের কাছ থেকে দিল্লির প্রত্যাশাগুলো তুলে ধরার একটি সুযোগ হবে।
প্রতিবেদন বরাত বলছে, সফরের চূড়ান্ত তারিখ এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। তবে সবকিছু ঠিক থাকলে, আগামী সপ্তাহে তারেক রহমানের এই দিল্লি সফর হতে পারে ভারত-বাংলাদেশ নতুন রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রথম বড় পরীক্ষা। আপাতত উভয় পক্ষের মূল লক্ষ্য—পরস্পরের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা আবার শুরু করা এবং জটিল সংকটগুলো যেন সার্বিক সম্পর্ককে আটকে না ফেলে, সেই পথ তৈরি করা।


























