সংবাদ শিরোনাম ::
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এখনো আক্রমণের মুখে: সম্পাদক পরিষদ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ট্রাষ্টের মাসবপ্যাপী সেহরি বিতরণ চলমান সিলেটে গ্যাস সংকটে যানবাহনের ভাড়া বৃদ্ধি, ক্ষোভ সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে ৩৪ দিনে ৭০ লাখ ৮৮ হাজার ৬৭২ টাকা সিলেট রায়নগর রাজবাড়ী মিতালি ১১১ নম্বর বাসায় খুন হওয়া সাত্তার-সুরাইয়ার সন্তানসহ স্বজনদের শান্তনা দেন মন্ত্রী মুক্তাদির ও আরিফ বঙ্গবন্ধুর ৫১ তম শাহাদাত বার্ষিকী ঘিরে গোপালগঞ্জে নিরাপত্তা জোরদার সিলেটে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনে ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন সিলেট শাহজালাল (রহ.) মাজারের তৃতীয় দফায় দানবাক্স খুলে টাকা গণনা সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথরে গোসলে নেমে পর্যটকের মৃত্যু ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন গ্যাসের তীব্র সংকট : লাখ লাখ শ্রমিক কর্মহীন সিলেট মহানগর ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়

জৈন্তিয়ার ঐতিহ্য ‘ঢুপির সরাইখানা’, সংরক্ষণের দাবি

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০১:১৮:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬ ২০৫ বার পড়া হয়েছে

জৈন্তাপুর প্রতিনিধি :

সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার ঢুপি গ্রামে অবস্থিত জৈন্তিয়া রাজ্যের ঐতিহাসিক সরাইখানা বা পান্থশালা আজও অতীতের গৌরব বহন করে দাঁড়িয়ে আছে। জৈন্তিয়ার রাজা দ্বিতীয় রামসিংহের হাতে নির্মিত এই স্থাপনাটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ননিদর্শন হলেও এর প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে অনেকেই অবগত নন।

ঐতিহাসিকদের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৭৯৭ সালে ঢুপির মঠ নির্মাণের সময়ই রাজা দ্বিতীয় রামসিংহ দূর-দূরান্ত থেকে আগত যাত্রী, ব্যবসায়ী ও পূণ্যার্থীদের বিশ্রামের সুবিধার্থে এই সরাইখানা নির্মাণ করেন।

তৎকালীন সময়ে জৈন্তিয়া রাজ্যের সমতল অঞ্চলে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ। অসংখ্য খাল-বিল, হাওর ও নদী-নালায় সংযুক্ত ছিল পুরো এলাকা। ঢুপি গ্রামের সারীঘাট ছিল সেই নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। দক্ষিণ ও পূর্ব জৈন্তিয়ার মানুষ নৌকাযোগে সারীঘাটে এসে সেখান থেকে কয়েক মাইল হেঁটে রাজধানীতে পৌঁছাতেন। ব্যবসায়ীরাও জৈন্তাপুরী হাট থেকে পাহাড়ি পণ্য সংগ্রহ করে এখান থেকেই বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠাতেন।

সারীঘাট ছিল জৈন্তিয়ার সবচেয়ে ব্যস্ত নৌবন্দর। পূণ্যার্থী, সাধারণ যাত্রী, ব্যবসায়ী ও রাজস্ব কর্মচারীরা এখানে এসে আহার, বিশ্রাম ও যাত্রার প্রস্তুতি নিতেন। তাদের সুবিধার্থেই রাজা রামসিংহ সারীঘাটের উত্তর পাশে ঢুপির পাহাড়ের পাদদেশে এই সরাইখানা নির্মাণ করেন।

স্থাপনাটি মূলত একটি দোচালা ঘর, যেখানে একসঙ্গে ২০ থেকে ২৫ জন লোক থাকার ব্যবস্থা ছিল। পূর্ব পাশে রয়েছে বারান্দা, যার পাঁচটি খিলানে রয়েছে অনন্য কারুকাজ। দক্ষিণ দেয়ালেও দেখা যায় দৃষ্টিনন্দন নকশা। অত্যন্ত মজবুত নির্মাণশৈলীর কারণে ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পেও এটি ধ্বংস হয়নি। এখনো প্রায় অক্ষত অবস্থায় টিকে আছে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি।

তবে সরাইখানার সঙ্গে থাকা পাথরে বাঁধানো জলাধারটি ব্রিটিশ আমলে সিলেট-শিলং সড়ক নির্মাণের সময় ভরাট করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক প্রশস্ত করার সময়ও স্থাপনাটি ভেঙে ফেলার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে সেটি রক্ষা পায়। বর্তমানে মহাসড়কের দুই পাশ দিয়ে যানবাহন চলাচল করছে।

দীর্ঘদিন ধরে  সিলেট অঞ্চলের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক নিদর্শন ‘ঢুপির সরাইখানা’ শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি জৈন্তিয়া রাজ্যের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার জীবন্ত সাক্ষী। যথাযথ সংরক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে এটিকে জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে তুলে ধরা জরুরি।

সচেতন মহলের দাবি, প্রতিদিন ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে যেকোনো সময় দুর্ঘটনাবশত এই মূল্যবান প্রত্নসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই দ্রুত প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার এবং পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

জৈন্তিয়ার ঐতিহ্য ‘ঢুপির সরাইখানা’, সংরক্ষণের দাবি

আপডেট সময় : ০১:১৮:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬

জৈন্তাপুর প্রতিনিধি :

সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার ঢুপি গ্রামে অবস্থিত জৈন্তিয়া রাজ্যের ঐতিহাসিক সরাইখানা বা পান্থশালা আজও অতীতের গৌরব বহন করে দাঁড়িয়ে আছে। জৈন্তিয়ার রাজা দ্বিতীয় রামসিংহের হাতে নির্মিত এই স্থাপনাটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ননিদর্শন হলেও এর প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে অনেকেই অবগত নন।

ঐতিহাসিকদের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৭৯৭ সালে ঢুপির মঠ নির্মাণের সময়ই রাজা দ্বিতীয় রামসিংহ দূর-দূরান্ত থেকে আগত যাত্রী, ব্যবসায়ী ও পূণ্যার্থীদের বিশ্রামের সুবিধার্থে এই সরাইখানা নির্মাণ করেন।

তৎকালীন সময়ে জৈন্তিয়া রাজ্যের সমতল অঞ্চলে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ। অসংখ্য খাল-বিল, হাওর ও নদী-নালায় সংযুক্ত ছিল পুরো এলাকা। ঢুপি গ্রামের সারীঘাট ছিল সেই নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। দক্ষিণ ও পূর্ব জৈন্তিয়ার মানুষ নৌকাযোগে সারীঘাটে এসে সেখান থেকে কয়েক মাইল হেঁটে রাজধানীতে পৌঁছাতেন। ব্যবসায়ীরাও জৈন্তাপুরী হাট থেকে পাহাড়ি পণ্য সংগ্রহ করে এখান থেকেই বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠাতেন।

সারীঘাট ছিল জৈন্তিয়ার সবচেয়ে ব্যস্ত নৌবন্দর। পূণ্যার্থী, সাধারণ যাত্রী, ব্যবসায়ী ও রাজস্ব কর্মচারীরা এখানে এসে আহার, বিশ্রাম ও যাত্রার প্রস্তুতি নিতেন। তাদের সুবিধার্থেই রাজা রামসিংহ সারীঘাটের উত্তর পাশে ঢুপির পাহাড়ের পাদদেশে এই সরাইখানা নির্মাণ করেন।

স্থাপনাটি মূলত একটি দোচালা ঘর, যেখানে একসঙ্গে ২০ থেকে ২৫ জন লোক থাকার ব্যবস্থা ছিল। পূর্ব পাশে রয়েছে বারান্দা, যার পাঁচটি খিলানে রয়েছে অনন্য কারুকাজ। দক্ষিণ দেয়ালেও দেখা যায় দৃষ্টিনন্দন নকশা। অত্যন্ত মজবুত নির্মাণশৈলীর কারণে ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পেও এটি ধ্বংস হয়নি। এখনো প্রায় অক্ষত অবস্থায় টিকে আছে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি।

তবে সরাইখানার সঙ্গে থাকা পাথরে বাঁধানো জলাধারটি ব্রিটিশ আমলে সিলেট-শিলং সড়ক নির্মাণের সময় ভরাট করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক প্রশস্ত করার সময়ও স্থাপনাটি ভেঙে ফেলার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে সেটি রক্ষা পায়। বর্তমানে মহাসড়কের দুই পাশ দিয়ে যানবাহন চলাচল করছে।

দীর্ঘদিন ধরে  সিলেট অঞ্চলের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক নিদর্শন ‘ঢুপির সরাইখানা’ শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি জৈন্তিয়া রাজ্যের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার জীবন্ত সাক্ষী। যথাযথ সংরক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে এটিকে জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে তুলে ধরা জরুরি।

সচেতন মহলের দাবি, প্রতিদিন ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে যেকোনো সময় দুর্ঘটনাবশত এই মূল্যবান প্রত্নসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই দ্রুত প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার এবং পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।