জাতীয় জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা,মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, বঙ্গবীর, জেনারেল এম এ জি ওসমানী’র জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি
- আপডেট সময় : ০৩:৫১:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে
নিজস্ব প্রতিনিধি :
মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক,সংসদীয় গণতন্ত্রের আপোষহীন সৈনিক, নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিক, বঙ্গবীর জেনারেল মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী’র ১০৮ তম জন্ম বার্ষিকীতে তাঁর প্রতি সশ্রদ্ধচিত্তে শ্রদ্ধা জানাই।
মঙ্গলবার ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিঃ,, তিনি ছিলেন নিখাদ দেশপ্রেমিক ও আজীবন গণতন্ত্রী। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত বিলিয়ে দিয়েছেন দেশ ও জাতির জন্য। পাকিস্তান ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের রণসংগীত হিসেবে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘চল্ চল্ চল্, ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল’ গানটি সরকারি অনুমোদন আদায় ও বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিষ্ঠা ছিল স্বাধিকার ও স্বাধীনতার সূতিকাগার।
বঙ্গবীর ওসমানী স্বাধীন ও স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সমরনায়ক ছিলেন। শুধুমাত্র ভৌগোলিক ও মানচিত্রগত পরিবর্তন তার কাম্য ছিল না। রাষ্ট্রীয় পরিচয়, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব, স্বার্বভৌমত্ব সবই তিনি চেয়েছেন। উপনিবেশবাদী দেশ ও শক্তির মধ্যকার দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং সাম্রাজ্যের ভাগবাটোয়ারার ফসল হিসেবে অতীতে অনেক দেশ স্বাধীন হয়েছে। এমন স্বধীনতা তিনি চাননি। সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ শোষণ-আধিপত্য থেকে মুক্ত স্বাধীন দেশ চেয়েছিলেন। জাতিগত ও শ্রেণিগত শোষণ থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন।তিনি জাতীয় জনতা পার্টির শ্লোগান প্রণয়ন করেন, দেশকার,দেশকার,জনতার,জনতার, জনতার এই দেশ জনতাকে ফিরিয়ে দাও।

তার মতে আমাদের স্বাধীনতা একসাথে হয়নি। ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধিকার ও স্বাধীনতার সংগ্রাম কয়েকটি স্তরে অর্জিত হয়েছে। ভাষা শহীদদের রক্ত এ দেশের উর্বর মাটিতে বপন করেছিল স্বাধীনতার বীজ। যার একপ্রান্তে ভাষা আন্দোলন আর অন্যপ্রান্তে মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানি শাসকশ্রেণি বাঙালির ভাষা-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বিনষ্ট এবং জাতিগত বৈষম্য ও নিপীড়নের এক নিষ্ঠুর পথে অগ্রসর হলে তা প্রতিরোধ করা ছাড়া আর কোন গত্যন্তর ছিল না।
এমএজি ওসমানী’র নির্দেশনা অনুযায়ী সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। প্রতিটি সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে এক একজন সেনাবাহিনীর অফিসারকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি বিভিন্ন সেক্টর ও বাহিনীর মাঝে সমন্বয় সাধন করা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, অস্ত্রের যোগান নিশ্চিত করা, গেরিলা বাহিনীর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করাসহ সকল কাজ সাফল্যের সাথে পালন করেন। তার সুশৃঙ্খল নেতৃত্বে মাত্র নয় মাসের যুদ্ধে শত্রুসেনাদের পযুর্দস্ত করে বিজয় অর্জন সম্ভব হয়েছিল। এই যুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান নিশ্চিত হয়।
ওসমানী মনে করতেন, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ কেবল পাকিস্তানের রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে আরেকটি অনুরূপ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ প্রয়াস ছিল না। নাগরিকদের জন্য ‘অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবন ধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা’, ‘সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা’, ‘মানুষে-মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ ইত্যাদি ছিল স্বাধীনতার মূল মন্ত্র। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার’ Equality, Human Dignity and Social justice এই তিনটিই ছিল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত রাষ্ট্রের আদর্শ ও রাষ্ট্রীয় দর্শন।
স্বাধীনতার মূল মন্ত্র বাস্তবায়নের লক্ষে ১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ওসমানী ‘জাতীয় জনতা পার্টি’ নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। ১৯৭৮ সালের ৩ জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জাতীয় জনতা পার্টি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, জাতীয় আওয়ামী পার্টি (মোজাফ্ফর), বাংলাদেশ পিপলস লীগ, গণ আজাদী লীগ এই ৫ দলের গণ ঐক্য জোটের প্রার্থী ছিলেন তিনি। এই নির্বাচনে মোট ১০ জন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। নির্বাচনে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হিসেবে জয়লাভ করেন। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৩৯ জন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। নির্বাচনে জয়লাভ করেন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার।
এই দুই নির্বাচনে পরাজয়ের কারণে তার মনে কোন অনুশোচনা ছিল না। গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জনগণের কাছে তার বক্তব্য তুলে ধরতে পেলে তিনি সুখী ছিলেন।
বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহকর্মী হওয়া সত্ত্বেও ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হলে তিনি সংসদ সদস্যপদ এবং আওয়ামী লীগের সদস্যপদ ত্যাগ করেন। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তার বক্তব্য শুনেছি। আমাদের অতি প্রিয় সাবেক এমপি নুরুল ইসলাম খানসহ যারা তার সাথে ছিলেন, তারা এখনো সময়ের সাক্ষী হয়ে আছেন।
এমএজি ওসমানী ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ-বিশ্বনাথ এলাকা থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের ২৬ ডিসেম্বর তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জেনারেল পদমর্যাদা প্রদান করা হয়। নতুন দেশের প্রথম সশস্ত্র বাহিনী প্রধান হিসেবে নিযুক্তি পান। ১৯৭২ সালের ১২ এপ্রিল তিনি তার এ দায়িত্ব থেকে অবসর নেন এবং অভ্যন্তরীণ নৌ যোগাযোগ, জাহাজ ও বিমান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রীসভায় যোগ দেন।
১৯৭৩ সালের মার্চে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়৷ ওই নির্বাচনে এমএজি ওসমানী তার নিজের এলাকা থেকে অংশ নেন এবং নির্বাচনে অভাবনীয় সাফল্য লাভ করেন ৷ এই নির্বাচনে ওসমানী ৯৪ শতাংশ ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন ৷ তখন তিনি ডাক, তার, টেলিযোগাযোগ, অভ্যন্তরীণ নৌ যোগাযোগ, জাহাজ ও বিমান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৪ সালের মে মাসে মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ধোপাদীঘির পাড়ে ওসমানীর পৈতৃক বাড়িটি পাকিস্তানি হানাদারেরা ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে যুদ্ধ শেষে তিনি নিজ উদ্যোগে সেখানে বাংলো টাইপ ঘর নির্মাণ করেন। ১৯৭৬ সালের ১৮ মে এ বাড়ির ২ বিঘা জায়গা দিয়ে তিনি তার বাবা-মায়ের নামে গঠন করেন জুবেদা খাতুন-খান বাহাদুর মফিজুর রহমান ট্রাস্ট। এ ট্রাস্টের মাধ্যমে প্রতি বছর মেডিকেল ছাত্রছাত্রীদের একটি নির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে বৃত্তি প্রদান করা হয়।
১৯৮৭ সালের ৪ মার্চ ওসমানী জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। সেই থেকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় জাদুঘরের একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছে এটি। এছাড়া ঢাকার ধানমন্ডির (রোড-১০-এ, বাড়ি নং ৪২) সুন্দরবন নামক ওসমানীর নিজস্ব বাড়ির সম্পত্তি দিয়ে আর্তমানবতার সেবার লক্ষ্যে গঠন করা হয়েছে ওসমানী ট্রাস্ট।
বঙ্গবীর এমএজি ওসমানী স্মরণে ঢাকায় গড়ে উঠেছে ওসমানী উদ্যান ও স্থাপিত হয়েছে বাংলাদেশ সচিবালয়ের বিপরীতে ওসমানী মেমোরিয়াল হল। সরকারি উদ্যোগে সিলেট শহরে তার নামে একটি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের নামকরণ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ওসমানী নগর থানার দয়ামীরে ওসমানী স্মৃতি যাদুঘর ও গ্রন্থাগার ইত্যাদি।
বালাগঞ্জ উপজেলাকে ভেঙে ওসমানী নগর থানা করা হয়েছে। নামকরণ করা হয়েছে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। সিলেটে বঙ্গবীর ওসমানী শিশু উদ্যান, বঙ্গবীর রোডসহ অসংখ্য স্বীকৃতি স্থাপন করা হয়েছে।
তবে জাতীয় জীবনে জেনারেল ওসমানীকে আরও মূল্যায়ন করা উচিত। সেই সাথে ওসমানীর জীবনী পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্তি, রাষ্ট্রীয় মার্যাদায় জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালনের দাবি জানাই।











