রিকশার ব্যাটারিতে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি, বছরে তৈরি হচ্ছে ৫ লাখ টন সিসাজনিত বর্জ্য
- আপডেট সময় : ০২:০৫:৫০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬ ১৩ বার পড়া হয়েছে
ভিউ নিউজ ৭১ ডেস্ক :
ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্যান ও অটোরিকশার কারণে প্রতিবছর দেশে প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার টন সিসা, অ্যাসিড ও ব্যাটারি বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। ৭০ শতাংশ ব্যাটারি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ভাঙা হয়। ফলে শুধু ঢাকায় বসবাসরত ৯৮ শতাংশ শিশুর রক্তে উদ্বেগজনক মাত্রার বেশি সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী সারা দেশে আনুমানিক ৬০ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায়ই রয়েছে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ। এই রিকশাগুলো চলে ‘সিসা, অ্যাসিড ও ব্যাটারি’র শক্তি ব্যবহার করে। এ সিসার কারণেই মানুষের উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ, মস্তিষ্ক, কিডনি, লিভার ও স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি হয়, অকাল গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়ায়। দেশের মাটি, পানি, বাতাসের মাধ্যমে সিসা খাদ্যে প্রবেশ করছে। আর খাবারের মাধ্যমে সিসা ঢুকে যাচ্ছে শরীরে। তাই মানুষের দেহেও মিলেছে মাত্রাতিরিক্ত সিসার উপস্থিতি। সিসা মাটিতে ৭০০ বছর পর্যন্ত টিকে থেকে মানবদেহের ক্ষতি করে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি), ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গবেষণা প্রতিবেদন থেকে এসব ভয়াবহ তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, মানভেদে রিকশায় ব্যবহৃত ব্যাটারির আয়ুষ্কাল সর্বোচ্চ এক বছর। ফলে এসব ব্যাটারি ঘন ঘন পালটাতে হয়। এতে সিসার উপস্থিতি আরও বাড়ে। ঢাকা ও আশপাশের শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়ানো-ছিটানো কারখানার কর্মীরা কোনোরকম ব্যবস্থাপনা বা সুরক্ষা ছাড়াই খালি হাতে ব্যাটারি খুলছে। সেখান থেকে সিসা বের করছে, আবার ব্যবহার করছে বা গলাচ্ছে। নতুনভাবে ব্যাটারি তৈরি করছে। এ সময় সিসাসহ অন্যান্য বিষাক্ত উপাদান সরাসরি পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বিপজ্জনক বর্জ্যও বেড়ে যায়। এই বর্জ্যগুলো মাটি, পানি, বাতাস ও খাদ্যে মিশে মানবদেহে বিষাক্ত সিসার পরিমাণ বাড়ায় এবং মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞরা যুগান্তরকে বলছেন, সিসা হলো-ভূপৃষ্ঠে পাওয়া একটি ভারী ধাতু। সহজে গলনক্ষমতাযুক্ত সিসা অত্যন্ত বিষাক্ত পদার্থ হওয়ায় গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। সিসার কোনো মাত্রাকেই নিরাপদ হিসাবে গণ্য করা হয় না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে-সিসার সংস্পর্শ শিশুদের স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি, বৃদ্ধি ও বিকাশের গতি ধীর করে। শিশুদের শেখা ও আচরণগত সমস্যা যেমন-বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও আইকিউ কমে যাওয়া, অতিসক্রিয়তা, শ্রবণ, বাক সমস্যা ও রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে। শিশুর মস্তিষ্ক, কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করে। গর্ভবতীদের গর্ভপাতের ঝুঁকি বৃদ্ধি, অকাল প্রসব ও কম ওজনের শিশু জন্ম দিতে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে উচ্চরক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়, কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত করে, পুরুষ ও নারীদের প্রজনন সমস্যা সৃষ্টি, স্মৃতি ও মনোযোগ ঘাটতি বাড়ায়।
সিসার ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আইসিডিডিআর’বি ২০২২ থেকে ২০২৪ সালে একটি গবেষণা করে। গবেষণায় ২ থেকে ৪ বছর বয়সি ৫০০ শিশুর রক্ত পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় প্রত্যেকের শরীরেই সিসা পাওয়া গেছে (মধ্যম মাত্রা ৬৭ মাইক্রোগ্রাম/লিটার) ভয়াবহভাবে, ৯৮ শতাংশ শিশুর রক্তে। মানদণ্ড অনুসারে উদ্বেগজনক মাত্রার বেশি সিসা (৩৫ মাইক্রোগ্রাম/লিটার) রয়েছে। গবেষণায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, সিসানির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি উৎপাদন ও রিসাইক্লিং কারখানা, সিসা গলানোর কেন্দ্র এই দূষণের প্রধান উৎস। এছাড়া বাড়ির ভেতরে ধূমপান, ধূলিকণা, সিসাযুক্ত প্রসাধনী ও রান্নার পাত্র থেকেও শিশুদের শরীরে সিসা ঢুকছে। গবেষণায় আরও দেখা যায়, রাজধানীর আশপাশে সিসানির্ভর কারখানার ১ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা অন্যদের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেশি।
আইসিডিডিআর’বির সিসা গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও প্রতিষ্ঠানটির প্রকল্প সমন্বয়কারী ডা. মো. মাহবুবুর রহমান। তিনি সাংবদিকদের বলেন, একটি অটোরিকশায় গড়ে ৫টা ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়। মানভেদে যেগুলোর কার্যকারিতা থাকে ৬ থেকে ৯ মাস। এরপর রিসাইকেল করে রিইউজ ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা ছাড়াই খোলা জায়গায় ব্যাটারি রিসাইকেল করা হয়। এ সময় ওই এলাকায় মানুষ, পশু-পাখি, পানি, মাটি বায়ু সবকিছু দূষিত করে। সরাসরি ব্যাটারি রিসাইকেলের সঙ্গে জড়িত এবং ওই এলাকার ৫০০ মিটারের মধ্যে যারা থাকে তাদের ক্ষতির মাত্রা সবচেয়ে বেশি। সিসা দূষণে শিশু শারীরিক-মানসিক ও বুদ্ধিবিকাশজনিত স্থায়ী ক্ষতির মুখে পড়ে। শিশুর আইকিইউ কমিয়ে পড়াশোনা ও কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ, হরমোনাল নানা সমস্যা বেশি দেখা দেয়।
তিনি বলেন, যেহেতু সিসার ক্ষতির মাত্রা বেশি তাই পরিত্রাণের জন্য এটার ব্যবহার এবং পুনঃপ্রক্রিয়াজাত বন্ধ করতে হবে। ব্যবহার করলে ক্রমান্বয়ে রিসাইকেলে যেতে হবে। নতুন টেকনোলজির দিকে যেতে হবে। প্রয়োজনে লেড-অ্যাসিড ও লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির পরিবর্তে নিকেল জিঙ্ক ব্যাটারি ব্যবহার করা যেতে পারে। ঢাকা ছাড়াও বিভিন্ন জেলায় বিভিন্নভাবে ছোট-বড়-মাঝারি বিভিন্ন ধরনের ইন্ডাস্ট্রি আছে যেগুলোর রেগুলেশন (নিয়মের মধ্যে আনা) দরকার।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে সিসাদূষণে আক্রান্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশ চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে, যেখানে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ শিশু রক্তে উচ্চমাত্রার সিসা নিয়ে জীবনধারণ করছে।
সিসার ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছে ‘এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো)।’ এর মহাসচিব ড. শাহরিয়ার হোসেন সাংবদিকদেরকে বলেন, সাধারণত রিকশায় ইউজ ব্যাটারির (আগে ব্যবহৃত হয়েছে এমন) পুনঃব্যবহার করা হয়। এ কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে শরীরে সিসা প্রবেশ করে। আশপাশে বসবাসকারীরাও ইনফেক্টেড হয়। এ ছাড়া সিসাসহ অন্যান্য বর্জ্য ড্রেনের মাধ্যমে নদীনালা খালের মাছের পেটে যাচ্ছে। এভাবে সিসা আমাদের খাদ্য চক্রে প্রবেশ করছে। এতে পরিবেশ দূষণসহ ব্যাপক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।


















