সংবাদ শিরোনাম ::
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এখনো আক্রমণের মুখে: সম্পাদক পরিষদ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ট্রাষ্টের মাসবপ্যাপী সেহরি বিতরণ চলমান জাতীয় স্কুল ক্রিকেটে সিলেটে চ্যাম্পিয়ন সৈয়দ হাতিম আলী উচ্চ বিদ্যালয় ১০০ দিনে ৬০৫ খুন: টিআইবির পরিসংখ্যান নিয়ে যে ব্যাখ্যা পুলিশ সদর দপ্তরের হবিগঞ্জ চা শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধের দাবিতে ইউএনও’র কাছে স্মারকলিপি হবিগঞ্জ বাহুবল-রাজাপুর সড়ক সংস্কারে অনিয়ম সিলেট হাম ও হাম উপসর্গ নিয়ে এক শিশুর মৃত্যু সিলেট পুলিশের অভিযানে বিভিন্ন অপরাধে গ্রেফতার ১৭১ সিলেট চোরাই পণ্য বালুর ট্রাক ও প্রাইভেট কারসহ আটক ১ সিলেট-ঢাকা মহাসড়কে যাত্রীবাহী একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিহত ৪ প্রতিদিন রাতে গরম দুধের সঙ্গে খেজুর খেলে মিলবে যেসব উপকার ৪০ বছর পর বাংলাদেশ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান

সিলেটে ব্রাশফায়ারের পর আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় একশ’ লাশে

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:২৩:৫৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ৯৪ বার পড়া হয়েছে

ভিউ নিউজ ৭১ ডেস্ক :

২৬ মে,   ১৯৭১। সকাল প্রায় দশটা। ক্যাপ্টেন নুরউদ্দিন খানের নেতৃত্বে শেরপুর থেকে পাকিস্তানি আর্মিদের নির্দেশে শান্তি কমিটি গঠনের নামে সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার বুরুঙ্গা হাই স্কুলে জড়ো করা হয় বিভিন্ন গ্রামের সহজ সরল নারী-পুরুষদের। পাকসেনারা আগের দিন বাজারে জানিয়ে গিয়েছিল কেউ যাতে কারো ওপর অত্যাচার করতে না পারে সেজন্য সবাইকে ‘শান্তি কার্ড’ দেয়া হবে।

স্কুলের অফিস কক্ষে হিন্দুদের আর ক্লাশরুমগুলোতে মুসলমানদের আলাদা করে রাখা হয়। এরপর ঘটে নারকীয় হত্যাকাণ্ড। ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয় হিন্দু সম্প্রদায়ের শতাধিক লোককে। যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ‘বুরুঙ্গা গণহত্যা’ হিসেবে পরিচিত। ওই সময় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান বুরুঙ্গা হাই স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক শ্রীনিবাস চক্রবর্তী। 

শ্রীনিবাস চক্রবর্তী জানান, সেসময় তিনি ছিলেন আঠারো বছরের কলেজ পড়ুয়া যুবক। হিন্দুদের সাথে তাকেও একটি স্কুলের অফিস কক্ষে আলাদা করার পর সেখানে পরিবারের অন্য সদস্যদের দেখে হতবাক হয়ে পড়েন। নিজে বেঁচে গেলেও পাক হানাদারদের হাতে শহীদ হন তাঁর বাবা ও ছোটভাই। 

শ্রীনিবাস বলেন, ‘সেদিন মুসলমানদের নেতৃস্থানীয় ১০-১২ জনকে রেখে বাকিদের ছেড়ে দেয়া হয়। স্কুলে আটকে রাখা হয় শুধুমাত্র হিন্দুদের। আটক মুসলমানদের কয়েকজনকে দিয়ে পাক আর্মি দড়ি ও কেরোসিন আনায়। এরপর হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনদের দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। একেক দড়ি দিয়ে ৪-৫ জন করে বেঁধে স্কুলের পেছনে নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় বুরঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক প্রীতিরঞ্জন চৌধুরী লাফ দিয়ে পেছন দিকে পালাতে থাকেন। তখন আর্মিরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি করলেও সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান। একইভাবে সেদিন রানু মালাকার নামেরও একজন পালাতে সক্ষম হন।’ 

শ্রীনিবাস চক্রবর্তীর সাথে আটকা ছিলেন তার বাবা ও ছোটভাই। সেদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শ্রীনিবাস বলেন, ‘ছোট ভাইটি ঘটনার পরিণতি আঁচ করতে পেরেছিল। আমি যখন চুপ হয়ে আছি তখন সে করুন সুরে চুপিচুপি বলে ওঠে- ‘দাদা আমি বুঝি আর মাকে দেখতে পারব না’। 

ছোট্টভাইয়ের এই কথাটা আজও আমাকে বেদনাভারাক্রান্ত করে তোলে। ৪-৫ জন করে এক এক দলে রেখে প্রায় ১০০ জন হিন্দুকে লাইনে দাঁড় করানো হল। প্রাণভয়ে সিলেট থেকে পালিয়ে আসা জজকোটের উকিল রামরঞ্জন ভট্টাচার্যকে স্কুলের বারান্দায় চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়। পরে থাকে চলে যাওয়ার কথা বলে পেছন থেকে গুলি করে মারে পাক আর্মিরা। এরপর লাইনে দাঁড়ানোদের লক্ষ্য করে দু’জন পাক আর্মি মেশিনগান দিয়ে ব্রাশফায়ার করে। আমার দু’হাত বাঁধা ছিল, কিন্তু স্কাউটের ট্রেনিং থাকায় জানতাম কোন পজিশনে থাকলে গুলি কম লাগবে। গুলি শুরু হওয়ার সাথে সাথে আমি কাত হয়ে পড়ে গেলাম, একটা গুলি আমার হাতে লেগে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। কিন্তু সেদিকে না তাকিয়ে পড়ে রইলাম। ব্রাশফায়ারে আহতদের পরে রাইফেল দিয়ে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে পাক আর্মিরা। আমি তখনও মরার মত পড়ে থাকায়, আমার দিকে রাইফেল তাক করা হয়নি।

পাক সেনাদের বর্বরতার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রাক্তন এই শিক্ষক বলেন, ‘সবাই মরে গেছে নিশ্চিত হয়ে স্থানীয় লোকদের দিয়ে লাশের উপর কেরোসিন ঢালায় পাকিরা। আমার গায়েও কেরোসিনের ছিটে পড়ায় বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমি লাইনের শেষ প্রান্তে ছিলাম, আগুন দেওয়ার পর পড়ে থাকা জীবিতরা চিৎকার শুরু করে। তখন পাক সেনারা ফের এসে তাদেরকে গুলি করে। 

দ্বিতীয়বার যখন আর্মিরা গুলি চালায় তখন দুটি গুলি আমার পিঠ স্পর্শ করে চলে যায়। আগুনে পুড়ে যাবো জেনেও আমি প্রায় পনের মিনিট মরার মতো পড়ে রইলাম। এরপর পাক আর্মিরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেছে নিশ্চিত হয়ে আমি উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমার একটা হাত প্রায় অবশ হয়ে গিয়েছিল। পিঠে গুলি লাগায় রক্ত ঝরছিল। বাড়ীতে যাওয়ার চিন্তা করছিলাম কিন্তু ভয় ছিল যদি পাক আর্মিরা বাড়িতে গিয়ে থাকে। অনেক চেষ্টায় হাতের বাঁধন খুলে স্কুলের পেছন দিকে গিয়ে এক বাড়িতে উঠি। এরপর বাড়িতে ফিরি।’

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

সিলেটে ব্রাশফায়ারের পর আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় একশ’ লাশে

আপডেট সময় : ০৬:২৩:৫৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫

ভিউ নিউজ ৭১ ডেস্ক :

২৬ মে,   ১৯৭১। সকাল প্রায় দশটা। ক্যাপ্টেন নুরউদ্দিন খানের নেতৃত্বে শেরপুর থেকে পাকিস্তানি আর্মিদের নির্দেশে শান্তি কমিটি গঠনের নামে সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার বুরুঙ্গা হাই স্কুলে জড়ো করা হয় বিভিন্ন গ্রামের সহজ সরল নারী-পুরুষদের। পাকসেনারা আগের দিন বাজারে জানিয়ে গিয়েছিল কেউ যাতে কারো ওপর অত্যাচার করতে না পারে সেজন্য সবাইকে ‘শান্তি কার্ড’ দেয়া হবে।

স্কুলের অফিস কক্ষে হিন্দুদের আর ক্লাশরুমগুলোতে মুসলমানদের আলাদা করে রাখা হয়। এরপর ঘটে নারকীয় হত্যাকাণ্ড। ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয় হিন্দু সম্প্রদায়ের শতাধিক লোককে। যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ‘বুরুঙ্গা গণহত্যা’ হিসেবে পরিচিত। ওই সময় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান বুরুঙ্গা হাই স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক শ্রীনিবাস চক্রবর্তী। 

শ্রীনিবাস চক্রবর্তী জানান, সেসময় তিনি ছিলেন আঠারো বছরের কলেজ পড়ুয়া যুবক। হিন্দুদের সাথে তাকেও একটি স্কুলের অফিস কক্ষে আলাদা করার পর সেখানে পরিবারের অন্য সদস্যদের দেখে হতবাক হয়ে পড়েন। নিজে বেঁচে গেলেও পাক হানাদারদের হাতে শহীদ হন তাঁর বাবা ও ছোটভাই। 

শ্রীনিবাস বলেন, ‘সেদিন মুসলমানদের নেতৃস্থানীয় ১০-১২ জনকে রেখে বাকিদের ছেড়ে দেয়া হয়। স্কুলে আটকে রাখা হয় শুধুমাত্র হিন্দুদের। আটক মুসলমানদের কয়েকজনকে দিয়ে পাক আর্মি দড়ি ও কেরোসিন আনায়। এরপর হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনদের দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। একেক দড়ি দিয়ে ৪-৫ জন করে বেঁধে স্কুলের পেছনে নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় বুরঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক প্রীতিরঞ্জন চৌধুরী লাফ দিয়ে পেছন দিকে পালাতে থাকেন। তখন আর্মিরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি করলেও সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান। একইভাবে সেদিন রানু মালাকার নামেরও একজন পালাতে সক্ষম হন।’ 

শ্রীনিবাস চক্রবর্তীর সাথে আটকা ছিলেন তার বাবা ও ছোটভাই। সেদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শ্রীনিবাস বলেন, ‘ছোট ভাইটি ঘটনার পরিণতি আঁচ করতে পেরেছিল। আমি যখন চুপ হয়ে আছি তখন সে করুন সুরে চুপিচুপি বলে ওঠে- ‘দাদা আমি বুঝি আর মাকে দেখতে পারব না’। 

ছোট্টভাইয়ের এই কথাটা আজও আমাকে বেদনাভারাক্রান্ত করে তোলে। ৪-৫ জন করে এক এক দলে রেখে প্রায় ১০০ জন হিন্দুকে লাইনে দাঁড় করানো হল। প্রাণভয়ে সিলেট থেকে পালিয়ে আসা জজকোটের উকিল রামরঞ্জন ভট্টাচার্যকে স্কুলের বারান্দায় চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়। পরে থাকে চলে যাওয়ার কথা বলে পেছন থেকে গুলি করে মারে পাক আর্মিরা। এরপর লাইনে দাঁড়ানোদের লক্ষ্য করে দু’জন পাক আর্মি মেশিনগান দিয়ে ব্রাশফায়ার করে। আমার দু’হাত বাঁধা ছিল, কিন্তু স্কাউটের ট্রেনিং থাকায় জানতাম কোন পজিশনে থাকলে গুলি কম লাগবে। গুলি শুরু হওয়ার সাথে সাথে আমি কাত হয়ে পড়ে গেলাম, একটা গুলি আমার হাতে লেগে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। কিন্তু সেদিকে না তাকিয়ে পড়ে রইলাম। ব্রাশফায়ারে আহতদের পরে রাইফেল দিয়ে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে পাক আর্মিরা। আমি তখনও মরার মত পড়ে থাকায়, আমার দিকে রাইফেল তাক করা হয়নি।

পাক সেনাদের বর্বরতার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রাক্তন এই শিক্ষক বলেন, ‘সবাই মরে গেছে নিশ্চিত হয়ে স্থানীয় লোকদের দিয়ে লাশের উপর কেরোসিন ঢালায় পাকিরা। আমার গায়েও কেরোসিনের ছিটে পড়ায় বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমি লাইনের শেষ প্রান্তে ছিলাম, আগুন দেওয়ার পর পড়ে থাকা জীবিতরা চিৎকার শুরু করে। তখন পাক সেনারা ফের এসে তাদেরকে গুলি করে। 

দ্বিতীয়বার যখন আর্মিরা গুলি চালায় তখন দুটি গুলি আমার পিঠ স্পর্শ করে চলে যায়। আগুনে পুড়ে যাবো জেনেও আমি প্রায় পনের মিনিট মরার মতো পড়ে রইলাম। এরপর পাক আর্মিরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেছে নিশ্চিত হয়ে আমি উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমার একটা হাত প্রায় অবশ হয়ে গিয়েছিল। পিঠে গুলি লাগায় রক্ত ঝরছিল। বাড়ীতে যাওয়ার চিন্তা করছিলাম কিন্তু ভয় ছিল যদি পাক আর্মিরা বাড়িতে গিয়ে থাকে। অনেক চেষ্টায় হাতের বাঁধন খুলে স্কুলের পেছন দিকে গিয়ে এক বাড়িতে উঠি। এরপর বাড়িতে ফিরি।’