সংবাদ শিরোনাম ::
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এখনো আক্রমণের মুখে: সম্পাদক পরিষদ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ট্রাষ্টের মাসবপ্যাপী সেহরি বিতরণ চলমান জাতীয় স্কুল ক্রিকেটে সিলেটে চ্যাম্পিয়ন সৈয়দ হাতিম আলী উচ্চ বিদ্যালয় ১০০ দিনে ৬০৫ খুন: টিআইবির পরিসংখ্যান নিয়ে যে ব্যাখ্যা পুলিশ সদর দপ্তরের হবিগঞ্জ চা শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধের দাবিতে ইউএনও’র কাছে স্মারকলিপি হবিগঞ্জ বাহুবল-রাজাপুর সড়ক সংস্কারে অনিয়ম সিলেট হাম ও হাম উপসর্গ নিয়ে এক শিশুর মৃত্যু সিলেট পুলিশের অভিযানে বিভিন্ন অপরাধে গ্রেফতার ১৭১ সিলেট চোরাই পণ্য বালুর ট্রাক ও প্রাইভেট কারসহ আটক ১ সিলেট-ঢাকা মহাসড়কে যাত্রীবাহী একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিহত ৪ প্রতিদিন রাতে গরম দুধের সঙ্গে খেজুর খেলে মিলবে যেসব উপকার ৪০ বছর পর বাংলাদেশ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান

উত্তরায় ছয়তলা আবাসিক ভবনে আগুন, ৬ জনের মৃত্যু

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০১:৩৪:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬ ৯৯ বার পড়া হয়েছে

রাজধানীর উত্তরায় শুক্রবার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ছে ভবন।

ভিউ নিউজ ৭১ ডেস্ক :

রাজধানীর উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের একটি আবাসিক ভবনে লাগা আগুনে একই পরিবারের তিনজনসহ মোট ছয়জনের করুণ মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার সকালে ৩৪ নম্বর ছয়তলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে ভবনের দুটি ফ্লোরে। আতঙ্কে চিৎকার শুরু করেন ভবনের অন্যান্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা। ফ্ল্যাটের অনেক বাসিন্দা বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাঁচার আকুতি জানান। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের ভবনের বাসিন্দাদের মাঝেও।

সরেজমিন দেখা যায়, ছয়তলা ভবটির দ্বিতীয় ও তৃতীয়তলায় ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট রয়েছে। সেই ফ্ল্যাট থেকেই আগুনের সূত্রপাত। সেখানে থাকতেন ভবন মালিক। আগুন লাগার পর তারা নিরাপদে বাসা থেকে বের হয়ে গেলেও পঞ্চম ও ষষ্ঠতলার ছয় বাসিন্দা মারা যান। ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন, আগুন নেভানোর পর তিনজনের লাশ উদ্ধার করে তারা। এছাড়া ১৩ জনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠায়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়।

নিহত ছয়জন দুই পরিবারের সদস্য বলে জানা গেছে। আগুনের ধোঁয়ায় শ্বাস বন্ধ হয়ে মৃতদের মধ্যে ফাইয়াজ রিশান নামে আড়াই বছর বয়সি এক শিশুও রয়েছে। তীব্র আগুনে সৃষ্ট ধোঁয়ার কুণ্ডলি পঞ্চম ও ষষ্ঠতলার ফ্ল্যাটে ঢুকে সাপোকেশনে প্রাণহানি হয়েছে বলে জানায় ফায়ার সার্ভিস। আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি তারা। ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক ধারণা, বৈদ্যুতিক গোলোযোগ থেকে আগুনের সূত্রপাত।

ভবনের মালিক সব সময়ই ছাদের গেট বন্ধ রাখেন। এতে ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা। এ প্রাণহানির জন্য ভবন মালিকের অবহেলাকে দুষছেন তারা। তার গ্রেফতারও দাবি করছেন। উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ সূত্র জানায়, উত্তরা পশ্চিম থানাধীন উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরস্থ ১৮ নম্বর রোডের ৩৪ নম্বর ভবনে শুক্রবার সকাল অনুমান পৌনে ৭টার দিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ছয়তলা বিশিষ্ট ভবনে আগুন ধরলে ভবনে বসবাসকারীরা আটকা পড়েন। পরে ফায়ার সার্ভিসের চার ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণসহ লোকজন উদ্ধারে কাজ করে।

শুক্রবার দুপুরে উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল আহমেদ নিজ কার্যালয়ে যুগান্তরকে বলেন, রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করছি। গ্যাস সংযোগ অথবা বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। ফায়ার সার্ভিসের তদন্তে পরবর্তীতে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ জানা যাবে। তিনি আরও বলেন, ভবন মালিকের বিষয়ে তথ্য নেওয়া হচ্ছে। তিনি শুক্রবার ভোরে ঢাকার বাইরে গেছেন বলে জানতে পেরেছি।

ফায়ার সার্ভিস ও উত্তরা পশ্চিম থানা সূত্রে জানা গেছে, নিহতদের মধ্যে এক পরিবারের স্বামী-স্ত্রীসহ তিনজন রয়েছেন। তারা হলেন-কাজী ফজলে রাব্বি রিজভী (৩৮), তার স্ত্রী আফরোজা আক্তার সুবর্ণা (৩৭) এবং তাদের ছেলে কাজী ফাইয়াজ রিশান (২.৫)। রাব্বির বাড়ি কুমিল্লা সদর উপজেলার নানুয়া দিঘিরপাড়ে। তিনি এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসে চাকরি করতেন। তার স্ত্রী সুবর্ণা চাকরি করতেন স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসে। তাদের আরেক ছেলে ফাইয়াজ উত্তরায় নানির বাসায় থাকায় প্রাণে বেঁচে গেছে বলে পরিবারের সদস্যরা জানান।

সুবর্ণাকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। রাব্বিকে মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং রিশানকে ঢাকা স্পেশালাইজড হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকের বরাত দিয়ে পরিবারের সদস্যরা বলছেন, ওই তিনজনের কেউ দগ্ধ হননি। ধোঁয়ার কারণে অক্সিজেনের অভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্য পরিবারের সদস্যরা হলেন-মো. হারিছ উদ্দিন (৫২), তার ছেলে মো. রাহাব (১৭) এবং হারিছের ভাতিজি রোদেলা আক্তার (১৪)। তাদের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, ফল ব্যবসায়ী হারিছ দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। কিডনি জটিলতার কারণে তাকে নিয়মিত ডায়ালাইসিস করাতে হতো।

ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানান, শুক্রবার সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে উত্তরার ১১ সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের ৩৪ নম্বর বাসায় আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। সকাল ৭টা ৫৪ মিনিটে উত্তরা ফায়ার স্টেশন থেকে দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা দেয়। ফায়ার সার্ভিসের ইউনিটগুলো ৭টা ৫৮ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। প্রায় আধাঘণ্টার চেষ্টায় সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। পরে সকাল ১০টার দিকে আগুন সম্পূর্ণভাবে নির্বাপণ করা হয়।

তিনি বলেন, দ্বিতীয়তলায় আগুন লেগেছিল। ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে ঘটনাস্থলে তিনজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় ১৩ জনকে উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস। তাদের কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা।

স্থানীয়রা জানান, ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয়তলা নিয়ে একটি ডুপলেক্স ফ্ল্যাট। ওই ফ্ল্যাটের দ্বিতীয়তলার পশ্চিম পাশে আগুনের সূত্রপাত হয়। সেখানে একটি রান্নাঘর, একটি বেডরুম ও ড্রইং-ডাইনিং রুম আছে। এছাড়া, এসি, টিভি, ফ্রিজসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ব্যবহার সামগ্রী ও আসবাবপত্র রয়েছে। ফ্ল্যাটটিতে থাকতেন ভবন মালিক জুয়েল মোল্লা ও তার স্ত্রী।

শুক্রবার দুপুরে সরেজমিন দেখা গেছে, আগুন লাগা ভবনের মূল গেট বন্ধ করে অবস্থান নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সেখানে উৎসুক জনতার ভিড়। আবাসিক এই এলাকায় একটি ভবনের সঙ্গে আরেকটি ভবন প্রায় লাগোয়া। আগুন লাগা ভবনের বের হওয়ার রাস্তা একটিই। অন্য কোনো বিকল্প গেট নেই। ছয়তলা ভবনের ছাদে ওঠার গেটও সবসময় তালা মেরে রাখে। ফলে ভবনের বাসিন্দারা ছাদে যেতে পারেনি। ছাদ খোলা থাকলে এত প্রাণহানি হতো না বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

আগুন লাগা ভবনের পাশের ৩৬ নম্বর বাসার নিরপত্তা প্রহরী মো. মিজান যুগান্তরকে বলেন, সকাল ৭টার কিছু সময় আগে আগুন লাগে। বেশ কয়েকবার বিকট শব্দও শোনা গেছে। আগুন লাগা ভবনের বিপরীত পাশের ৩৫ নম্বর ভবনের বাসিন্দা খোকন খান যুগান্তরকে বলেন, আগুন লাগার পর এক হৃদয়বিদায়ক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ভবনের বাসিন্দারা উদ্ধারের আকুতি জানাতে থাকে। পরে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের লোক এসে উদ্ধার কাজ শুরু করে।

কেন এত প্রাণহানি : আগুন নেভাতে যাওয়া উত্তরা ফায়ার স্টেশনের কর্মকর্তারা জানান, ভবনটির ছাদের গেট তালাবদ্ধ ছিল। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সেখানে গিয়ে তালা ভেঙেছে। এছাড়া ভবনের পেছন সাইডের বিভিন্ন ফ্ল্যাটের গ্রিল কেটে পাশের ভবনের ছাদ দিয়ে বাসিন্দাদের উদ্ধার করা হয়েছে।

উত্তরা ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার আলম হোসেন যুগান্তরকে বলেন, আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেছি আগুন বেড়ে গেছে। ধোঁয়ায় পুরো ভবন ছেয়ে গেছে। ভবনটির দ্বিতীয় ও তৃতীয়তলায় ডুপলেক্স ফ্ল্যাটে প্রচুর ইন্টেরিয়রের কাজ ছিল। এছাড়া আসবাবপত্রও ছিল। সেগুলোতে লাগা আগুন দাউ দাউ করে জ্বলেছে। আগুনের ধোঁয়া ভেন্টিলেশন না পাওয়ায় সিঁড়ির মধ্যে চলে যায়। ভবনটির সিঁড়ির নিচে এবং উপরে প্রচণ্ড কালো ধোঁয়া ছিল। ছাদের গেট বন্ধ থাকায় ধোঁয়া বের হতে পারেনি। ফলে যে যে ফ্ল্যাটের দরজা খুলছে সেই ফ্ল্যাটের মধ্যে ধোঁয়ার কুণ্ডলি তৈরি হয়েছে। মূলত এই ধোঁয়া ও সাপোকেশনে প্রাণহানি ঘটেছে। অগ্নিদগ্ধ হয়ে কেউ মারা যায়নি।

তিনি বলেন, পাঁচ ও ছয়তলার যারা ফ্ল্যাটের দরজা খুলেছে তারাই আক্রান্ত হয়েছে। এই দুই ফ্ল্যাটের লোক মারা গেছে। যারা ফ্ল্যাটের দরজা খোলেনি তাদের কিছু হয়নি। তাদের আমরা উদ্ধার করেছি। তারা অক্ষত আছে।

আলম হোসেন বলেন, এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, প্রথমে তিনি ধোঁয়া দেখেছেন। অনেকক্ষণ ধোঁয়া বের হয়েছে। আগুন প্রথমে অল্প ছিল। পরে বড় হয়েছে। আগুন লাগার সময় তাৎক্ষণিক আমাদের ফোন দিলে এত প্রাণহানি হতো না। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক গোলোযোগ থেকে আগুনের সূত্রপাত।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

উত্তরায় ছয়তলা আবাসিক ভবনে আগুন, ৬ জনের মৃত্যু

আপডেট সময় : ০১:৩৪:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬

রাজধানীর উত্তরায় শুক্রবার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ছে ভবন।

ভিউ নিউজ ৭১ ডেস্ক :

রাজধানীর উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের একটি আবাসিক ভবনে লাগা আগুনে একই পরিবারের তিনজনসহ মোট ছয়জনের করুণ মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার সকালে ৩৪ নম্বর ছয়তলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে ভবনের দুটি ফ্লোরে। আতঙ্কে চিৎকার শুরু করেন ভবনের অন্যান্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা। ফ্ল্যাটের অনেক বাসিন্দা বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাঁচার আকুতি জানান। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের ভবনের বাসিন্দাদের মাঝেও।

সরেজমিন দেখা যায়, ছয়তলা ভবটির দ্বিতীয় ও তৃতীয়তলায় ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট রয়েছে। সেই ফ্ল্যাট থেকেই আগুনের সূত্রপাত। সেখানে থাকতেন ভবন মালিক। আগুন লাগার পর তারা নিরাপদে বাসা থেকে বের হয়ে গেলেও পঞ্চম ও ষষ্ঠতলার ছয় বাসিন্দা মারা যান। ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন, আগুন নেভানোর পর তিনজনের লাশ উদ্ধার করে তারা। এছাড়া ১৩ জনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠায়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়।

নিহত ছয়জন দুই পরিবারের সদস্য বলে জানা গেছে। আগুনের ধোঁয়ায় শ্বাস বন্ধ হয়ে মৃতদের মধ্যে ফাইয়াজ রিশান নামে আড়াই বছর বয়সি এক শিশুও রয়েছে। তীব্র আগুনে সৃষ্ট ধোঁয়ার কুণ্ডলি পঞ্চম ও ষষ্ঠতলার ফ্ল্যাটে ঢুকে সাপোকেশনে প্রাণহানি হয়েছে বলে জানায় ফায়ার সার্ভিস। আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি তারা। ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক ধারণা, বৈদ্যুতিক গোলোযোগ থেকে আগুনের সূত্রপাত।

ভবনের মালিক সব সময়ই ছাদের গেট বন্ধ রাখেন। এতে ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা। এ প্রাণহানির জন্য ভবন মালিকের অবহেলাকে দুষছেন তারা। তার গ্রেফতারও দাবি করছেন। উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ সূত্র জানায়, উত্তরা পশ্চিম থানাধীন উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরস্থ ১৮ নম্বর রোডের ৩৪ নম্বর ভবনে শুক্রবার সকাল অনুমান পৌনে ৭টার দিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ছয়তলা বিশিষ্ট ভবনে আগুন ধরলে ভবনে বসবাসকারীরা আটকা পড়েন। পরে ফায়ার সার্ভিসের চার ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণসহ লোকজন উদ্ধারে কাজ করে।

শুক্রবার দুপুরে উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল আহমেদ নিজ কার্যালয়ে যুগান্তরকে বলেন, রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করছি। গ্যাস সংযোগ অথবা বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। ফায়ার সার্ভিসের তদন্তে পরবর্তীতে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ জানা যাবে। তিনি আরও বলেন, ভবন মালিকের বিষয়ে তথ্য নেওয়া হচ্ছে। তিনি শুক্রবার ভোরে ঢাকার বাইরে গেছেন বলে জানতে পেরেছি।

ফায়ার সার্ভিস ও উত্তরা পশ্চিম থানা সূত্রে জানা গেছে, নিহতদের মধ্যে এক পরিবারের স্বামী-স্ত্রীসহ তিনজন রয়েছেন। তারা হলেন-কাজী ফজলে রাব্বি রিজভী (৩৮), তার স্ত্রী আফরোজা আক্তার সুবর্ণা (৩৭) এবং তাদের ছেলে কাজী ফাইয়াজ রিশান (২.৫)। রাব্বির বাড়ি কুমিল্লা সদর উপজেলার নানুয়া দিঘিরপাড়ে। তিনি এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসে চাকরি করতেন। তার স্ত্রী সুবর্ণা চাকরি করতেন স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসে। তাদের আরেক ছেলে ফাইয়াজ উত্তরায় নানির বাসায় থাকায় প্রাণে বেঁচে গেছে বলে পরিবারের সদস্যরা জানান।

সুবর্ণাকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। রাব্বিকে মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং রিশানকে ঢাকা স্পেশালাইজড হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকের বরাত দিয়ে পরিবারের সদস্যরা বলছেন, ওই তিনজনের কেউ দগ্ধ হননি। ধোঁয়ার কারণে অক্সিজেনের অভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্য পরিবারের সদস্যরা হলেন-মো. হারিছ উদ্দিন (৫২), তার ছেলে মো. রাহাব (১৭) এবং হারিছের ভাতিজি রোদেলা আক্তার (১৪)। তাদের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, ফল ব্যবসায়ী হারিছ দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। কিডনি জটিলতার কারণে তাকে নিয়মিত ডায়ালাইসিস করাতে হতো।

ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানান, শুক্রবার সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে উত্তরার ১১ সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের ৩৪ নম্বর বাসায় আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। সকাল ৭টা ৫৪ মিনিটে উত্তরা ফায়ার স্টেশন থেকে দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা দেয়। ফায়ার সার্ভিসের ইউনিটগুলো ৭টা ৫৮ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। প্রায় আধাঘণ্টার চেষ্টায় সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। পরে সকাল ১০টার দিকে আগুন সম্পূর্ণভাবে নির্বাপণ করা হয়।

তিনি বলেন, দ্বিতীয়তলায় আগুন লেগেছিল। ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে ঘটনাস্থলে তিনজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় ১৩ জনকে উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস। তাদের কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা।

স্থানীয়রা জানান, ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয়তলা নিয়ে একটি ডুপলেক্স ফ্ল্যাট। ওই ফ্ল্যাটের দ্বিতীয়তলার পশ্চিম পাশে আগুনের সূত্রপাত হয়। সেখানে একটি রান্নাঘর, একটি বেডরুম ও ড্রইং-ডাইনিং রুম আছে। এছাড়া, এসি, টিভি, ফ্রিজসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ব্যবহার সামগ্রী ও আসবাবপত্র রয়েছে। ফ্ল্যাটটিতে থাকতেন ভবন মালিক জুয়েল মোল্লা ও তার স্ত্রী।

শুক্রবার দুপুরে সরেজমিন দেখা গেছে, আগুন লাগা ভবনের মূল গেট বন্ধ করে অবস্থান নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সেখানে উৎসুক জনতার ভিড়। আবাসিক এই এলাকায় একটি ভবনের সঙ্গে আরেকটি ভবন প্রায় লাগোয়া। আগুন লাগা ভবনের বের হওয়ার রাস্তা একটিই। অন্য কোনো বিকল্প গেট নেই। ছয়তলা ভবনের ছাদে ওঠার গেটও সবসময় তালা মেরে রাখে। ফলে ভবনের বাসিন্দারা ছাদে যেতে পারেনি। ছাদ খোলা থাকলে এত প্রাণহানি হতো না বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

আগুন লাগা ভবনের পাশের ৩৬ নম্বর বাসার নিরপত্তা প্রহরী মো. মিজান যুগান্তরকে বলেন, সকাল ৭টার কিছু সময় আগে আগুন লাগে। বেশ কয়েকবার বিকট শব্দও শোনা গেছে। আগুন লাগা ভবনের বিপরীত পাশের ৩৫ নম্বর ভবনের বাসিন্দা খোকন খান যুগান্তরকে বলেন, আগুন লাগার পর এক হৃদয়বিদায়ক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ভবনের বাসিন্দারা উদ্ধারের আকুতি জানাতে থাকে। পরে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের লোক এসে উদ্ধার কাজ শুরু করে।

কেন এত প্রাণহানি : আগুন নেভাতে যাওয়া উত্তরা ফায়ার স্টেশনের কর্মকর্তারা জানান, ভবনটির ছাদের গেট তালাবদ্ধ ছিল। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সেখানে গিয়ে তালা ভেঙেছে। এছাড়া ভবনের পেছন সাইডের বিভিন্ন ফ্ল্যাটের গ্রিল কেটে পাশের ভবনের ছাদ দিয়ে বাসিন্দাদের উদ্ধার করা হয়েছে।

উত্তরা ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার আলম হোসেন যুগান্তরকে বলেন, আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেছি আগুন বেড়ে গেছে। ধোঁয়ায় পুরো ভবন ছেয়ে গেছে। ভবনটির দ্বিতীয় ও তৃতীয়তলায় ডুপলেক্স ফ্ল্যাটে প্রচুর ইন্টেরিয়রের কাজ ছিল। এছাড়া আসবাবপত্রও ছিল। সেগুলোতে লাগা আগুন দাউ দাউ করে জ্বলেছে। আগুনের ধোঁয়া ভেন্টিলেশন না পাওয়ায় সিঁড়ির মধ্যে চলে যায়। ভবনটির সিঁড়ির নিচে এবং উপরে প্রচণ্ড কালো ধোঁয়া ছিল। ছাদের গেট বন্ধ থাকায় ধোঁয়া বের হতে পারেনি। ফলে যে যে ফ্ল্যাটের দরজা খুলছে সেই ফ্ল্যাটের মধ্যে ধোঁয়ার কুণ্ডলি তৈরি হয়েছে। মূলত এই ধোঁয়া ও সাপোকেশনে প্রাণহানি ঘটেছে। অগ্নিদগ্ধ হয়ে কেউ মারা যায়নি।

তিনি বলেন, পাঁচ ও ছয়তলার যারা ফ্ল্যাটের দরজা খুলেছে তারাই আক্রান্ত হয়েছে। এই দুই ফ্ল্যাটের লোক মারা গেছে। যারা ফ্ল্যাটের দরজা খোলেনি তাদের কিছু হয়নি। তাদের আমরা উদ্ধার করেছি। তারা অক্ষত আছে।

আলম হোসেন বলেন, এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, প্রথমে তিনি ধোঁয়া দেখেছেন। অনেকক্ষণ ধোঁয়া বের হয়েছে। আগুন প্রথমে অল্প ছিল। পরে বড় হয়েছে। আগুন লাগার সময় তাৎক্ষণিক আমাদের ফোন দিলে এত প্রাণহানি হতো না। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক গোলোযোগ থেকে আগুনের সূত্রপাত।