সংবাদ শিরোনাম ::
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এখনো আক্রমণের মুখে: সম্পাদক পরিষদ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ট্রাষ্টের মাসবপ্যাপী সেহরি বিতরণ চলমান সিলেটে হামের উপসর্গে প্রাণ গেল তিন শিশুর সিলেটে শুভ উপনয়ন-সংস্কার অনুষ্ঠান ১৯ জুন মৌলভীবাজারে প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান; যুবক আটক সিসিকের প্রশাসককে স্মারক উপহার দিল ইউএস বাংলা  সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলারপ্রতিবাদে সিলেটে মানববন্ধন সিলেট জেলা হাসপাতাল অবশেষে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন, থাকছে যেসব সুবিধা সিলেটে আসেনি সালমান শাহ’র মরদেহ, উত্তোলনের আদেশ জাতীয় স্কুল ক্রিকেটে সিলেটে চ্যাম্পিয়ন সৈয়দ হাতিম আলী উচ্চ বিদ্যালয় ১০০ দিনে ৬০৫ খুন: টিআইবির পরিসংখ্যান নিয়ে যে ব্যাখ্যা পুলিশ সদর দপ্তরের হবিগঞ্জ চা শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধের দাবিতে ইউএনও’র কাছে স্মারকলিপি

সিলেটের জাফলং পাথরখেকোদের গ্রাসে বিলীন হচ্ছে জাফলং রাজবাড়ী

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১১:৫৬:২৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬ ৫৩ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিনিধি :

সিলেটের জাফলং পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জল আর পাহাড়ের মিতালি ঘেরা সেই নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস। প্রকৃতির রূপের কোলজুড়ে গোয়াইনঘাটের জাফলং কান্দবস্তি গ্রামের জুমপার এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা পাঁচশ’ বছর কিংবা তারও বেশি পুরনো ঐতিহ্যের সাক্ষী ‘জাফলং রাজবাড়ী’ এখন ধ্বংসের শেষ প্রান্তে।

পাথরখেকোদের গ্রাস এবং দীর্ঘদিনের অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের শেকড়। জাফলং নদীর পাড়ে দাঁড়ালে এখন আর শুধু পাথরের ঠুনঠুন শব্দ শোনা যায়না, শোনা যায় ধসে পড়া প্রাচীন ইটের নীরব ক্রন্দন।

ইতিহাসের ধুলিমাখা পাতা উল্টালে দেখা যায়, বর্তমানের এই অবহেলিত জাফলং একসময় ছিল একটি স্বাধীন খণ্ডরাজ্যের রাজধানী। ঐতিহাসিকদের মতে, ১৪৫০ থেকে ১৬০০ সালের মধ্যে জৈন্তিয়া সাম্রাজ্য একীভূত হওয়ার আগে জাফলং ছিল অন্যতম শক্তিশালী খণ্ডরাজ্য। পরবর্তীতে রাজধানী নিজপাটে স্থানান্তরিত হলেও জৈন্তিয়ার রাজারা এই রাজবাড়ীটিকে পরম মমতায় আগলে রেখেছিলেন। আবার অনেক ইতিহাসবিদের দাবি, ১৩০০ সালেরও আগে এখানে ‘মাধুর মাস্কুট’ বা ‘মালনিয়াং’ রাজ্যের প্রতাপ ছিল। নিয়াং রাজা ও মাইলং রাজাদের সেই রাজকীয় আভিজাত্যের শেষ চিহ্ন হিসেবে রাজবাড়ীটি শত শত বছর ধরে টিকেছিল।

১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর জৈন্তিয়া রাজ্যের পতনের সঙ্গে সঙ্গে এই স্থাপনার অবক্ষয় শুরু হয়। দীর্ঘ ১১২ বছরের শাসনামলে ব্রিটিশরা এখান থেকে বিপুল সম্পদ আহরণ করলেও এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। সেই অবহেলার ধারাবাহিকতা আজও অব্যাহত।

দীর্ঘদিন ধরে সিলেট অঞ্চলের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ বর্তমানে জাফলং রাজবাড়ীর দৃশ্য অত্যন্ত মর্মান্তিক। পাথরখেকোদের সীমাহীন লোভ আর তাণ্ডবে রাজধানীর মূল অংশ ইতিমধ্যে নদীগর্ভে সমাধি নিয়েছে। এমনকি প্রাচীন মাইলং রাজার বাড়িটিও ধ্বংসের চূড়ান্ত পর্যায়ে। পূর্বপাশের বড় অংশ ধসে পড়েছে। এটি শুধু একটি স্থাপনার ধ্বংস নয়, বরং আমাদের পাঁচশ বছরের ইতিহাসের দলিল সমাধি।

সরেজমিনে দেখা যায়, রাজবাড়ীর পশ্চিম ও উত্তর দিকের দেওয়ালগুলো পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। পূর্ব দিকের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন। দক্ষিণের প্রধান ফটকটি জরাজীর্ণ অবস্থায় কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে, যেন শেষ বিদায়ের অপেক্ষায়। অবাধ পাথর ও বালু উত্তোলনের ফলে মাটির গভীর থেকে ভিত্তি সরে যাচ্ছে। এর ফলে প্রতি বর্ষায় স্থাপনার অবশিষ্ট অংশগুলো আলগা হয়ে নদীতে ধসে পড়ছে। কৃত্রিম নদীভাঙন পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের কণ্ঠে আজ কেবলই হতাশা আর বেদনা। তাদের অভিযোগ, চোখের সামনে ইতিহাস ধ্বংস হয়ে গেলেও পাথরখেকোদের প্রভাবের কারণে তারা অসহায়।

এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, এই রাজবাড়ীর ইটে আমাদের পূর্বপুরুষদের ইতিহাস লেগে আছে। আজ টাকার লোভে কিছু মানুষ সবকিছু ধ্বংস করে দিচ্ছে। আমরা আমাদের পরিচয় হারিয়ে ফেলছি।

পরিবেশবিদ ও সচেতন মহল এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, জাফলং এলাকায় যেভাবে নির্বিচারে পাথর উত্তোলন চলছে, তা শুধু পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, বরং একটি জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংসের সামিল। অনেকেই একে সরাসরি ‌‘ঐতিহ্যিক হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।

সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। স্থানীয় সচেতন মহল, ইতিহাস অনুরাগী ও পরিবেশবাদীরা অবিলম্বে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে রাজবাড়ী এলাকাকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় এনে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণা করা, নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে সব ধরনের পাথর উত্তোলন বন্ধ করা, নদীভাঙন রোধে টেকসই সুরক্ষা বাঁধ নির্মাণ এবং অবশিষ্ট অংশগুলো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংস্কার করা।

জাফলং রাজবাড়ী কেবল একটি স্থাপনা নয়; এটি সিলেটের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং অস্তিত্বের প্রতীক। যথাসময়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে এই প্রাচীন নিদর্শন চিরতরে হারিয়ে যাবে। এখনই প্রয়োজন প্রশাসনের দৃঢ় ও আন্তরিক উদ্যোগ, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই পাঁচশ বছরের ঐতিহ্য থেকে বঞ্চিত না হয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

সিলেটের জাফলং পাথরখেকোদের গ্রাসে বিলীন হচ্ছে জাফলং রাজবাড়ী

আপডেট সময় : ১১:৫৬:২৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬

নিজস্ব প্রতিনিধি :

সিলেটের জাফলং পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জল আর পাহাড়ের মিতালি ঘেরা সেই নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস। প্রকৃতির রূপের কোলজুড়ে গোয়াইনঘাটের জাফলং কান্দবস্তি গ্রামের জুমপার এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা পাঁচশ’ বছর কিংবা তারও বেশি পুরনো ঐতিহ্যের সাক্ষী ‘জাফলং রাজবাড়ী’ এখন ধ্বংসের শেষ প্রান্তে।

পাথরখেকোদের গ্রাস এবং দীর্ঘদিনের অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের শেকড়। জাফলং নদীর পাড়ে দাঁড়ালে এখন আর শুধু পাথরের ঠুনঠুন শব্দ শোনা যায়না, শোনা যায় ধসে পড়া প্রাচীন ইটের নীরব ক্রন্দন।

ইতিহাসের ধুলিমাখা পাতা উল্টালে দেখা যায়, বর্তমানের এই অবহেলিত জাফলং একসময় ছিল একটি স্বাধীন খণ্ডরাজ্যের রাজধানী। ঐতিহাসিকদের মতে, ১৪৫০ থেকে ১৬০০ সালের মধ্যে জৈন্তিয়া সাম্রাজ্য একীভূত হওয়ার আগে জাফলং ছিল অন্যতম শক্তিশালী খণ্ডরাজ্য। পরবর্তীতে রাজধানী নিজপাটে স্থানান্তরিত হলেও জৈন্তিয়ার রাজারা এই রাজবাড়ীটিকে পরম মমতায় আগলে রেখেছিলেন। আবার অনেক ইতিহাসবিদের দাবি, ১৩০০ সালেরও আগে এখানে ‘মাধুর মাস্কুট’ বা ‘মালনিয়াং’ রাজ্যের প্রতাপ ছিল। নিয়াং রাজা ও মাইলং রাজাদের সেই রাজকীয় আভিজাত্যের শেষ চিহ্ন হিসেবে রাজবাড়ীটি শত শত বছর ধরে টিকেছিল।

১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর জৈন্তিয়া রাজ্যের পতনের সঙ্গে সঙ্গে এই স্থাপনার অবক্ষয় শুরু হয়। দীর্ঘ ১১২ বছরের শাসনামলে ব্রিটিশরা এখান থেকে বিপুল সম্পদ আহরণ করলেও এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। সেই অবহেলার ধারাবাহিকতা আজও অব্যাহত।

দীর্ঘদিন ধরে সিলেট অঞ্চলের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ বর্তমানে জাফলং রাজবাড়ীর দৃশ্য অত্যন্ত মর্মান্তিক। পাথরখেকোদের সীমাহীন লোভ আর তাণ্ডবে রাজধানীর মূল অংশ ইতিমধ্যে নদীগর্ভে সমাধি নিয়েছে। এমনকি প্রাচীন মাইলং রাজার বাড়িটিও ধ্বংসের চূড়ান্ত পর্যায়ে। পূর্বপাশের বড় অংশ ধসে পড়েছে। এটি শুধু একটি স্থাপনার ধ্বংস নয়, বরং আমাদের পাঁচশ বছরের ইতিহাসের দলিল সমাধি।

সরেজমিনে দেখা যায়, রাজবাড়ীর পশ্চিম ও উত্তর দিকের দেওয়ালগুলো পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। পূর্ব দিকের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন। দক্ষিণের প্রধান ফটকটি জরাজীর্ণ অবস্থায় কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে, যেন শেষ বিদায়ের অপেক্ষায়। অবাধ পাথর ও বালু উত্তোলনের ফলে মাটির গভীর থেকে ভিত্তি সরে যাচ্ছে। এর ফলে প্রতি বর্ষায় স্থাপনার অবশিষ্ট অংশগুলো আলগা হয়ে নদীতে ধসে পড়ছে। কৃত্রিম নদীভাঙন পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের কণ্ঠে আজ কেবলই হতাশা আর বেদনা। তাদের অভিযোগ, চোখের সামনে ইতিহাস ধ্বংস হয়ে গেলেও পাথরখেকোদের প্রভাবের কারণে তারা অসহায়।

এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, এই রাজবাড়ীর ইটে আমাদের পূর্বপুরুষদের ইতিহাস লেগে আছে। আজ টাকার লোভে কিছু মানুষ সবকিছু ধ্বংস করে দিচ্ছে। আমরা আমাদের পরিচয় হারিয়ে ফেলছি।

পরিবেশবিদ ও সচেতন মহল এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, জাফলং এলাকায় যেভাবে নির্বিচারে পাথর উত্তোলন চলছে, তা শুধু পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, বরং একটি জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংসের সামিল। অনেকেই একে সরাসরি ‌‘ঐতিহ্যিক হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।

সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। স্থানীয় সচেতন মহল, ইতিহাস অনুরাগী ও পরিবেশবাদীরা অবিলম্বে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে রাজবাড়ী এলাকাকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় এনে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণা করা, নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে সব ধরনের পাথর উত্তোলন বন্ধ করা, নদীভাঙন রোধে টেকসই সুরক্ষা বাঁধ নির্মাণ এবং অবশিষ্ট অংশগুলো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংস্কার করা।

জাফলং রাজবাড়ী কেবল একটি স্থাপনা নয়; এটি সিলেটের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং অস্তিত্বের প্রতীক। যথাসময়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে এই প্রাচীন নিদর্শন চিরতরে হারিয়ে যাবে। এখনই প্রয়োজন প্রশাসনের দৃঢ় ও আন্তরিক উদ্যোগ, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই পাঁচশ বছরের ঐতিহ্য থেকে বঞ্চিত না হয়।