বগুড়ায় যুবলীগের দুই নেতাকে কুপিয়ে হত্যা
- আপডেট সময় : ১১:৩৮:২৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অগাস্ট ২০২৪ ১৪৯ বার পড়া হয়েছে
ভিউ নিউজ ৭১ ডেস্ক :
বগুড়ায় যুবলীগের দুই নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গতকাল সোমবার রাতে বগুড়া শহরের মালগ্রাম দীঘিপাড়া ও শাজাহানপুর উপজেলার খড়না বাজারে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত দুজন হলেন বগুড়া পৌরসভার ১৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সদস্য রানা পাইকার (৩৪) ও শাজাহানপুর উপজেলার খড়না ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নুর আলম (২৮)। রানা পাইকার বগুড়া শহরের চাপড়পাড়া এলাকার বাসিন্দা ও নুর আলম শাজাহানপুরের খড়না ইউনিয়নের দেশমা গ্রামের বাসিন্দা। বগুড়া জেলা যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক জাকারিয়া আদিল নিহত দুজনের রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত করেছেন।
বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক আবদুল ওয়াদুদ প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল রাতে নুর আলমকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে মৃত অবস্থায় আনা হয়। তাঁর লাশ রাতেই স্বজনেরা নিয়ে গেছেন। অন্যদিকে রানা পাইকারের লাশ শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের মর্গে রাখা আছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল রাত আটটার দিকে একদল দুর্বৃত্ত বগুড়া শহরের মালগ্রাম দীঘিপাড়া এলাকায় যুবলীগ নেতা রানা পাইকারের ওপর হামলা চালিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে।
রাত ১০টার দিকে শাজাহানপুর উপজেলার খড়না বাজারে নুর আলমকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
শাজাহানপুর থানার ওসি শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘খড়না ইউনিয়নের দেশমা গ্রামের একজনকে কুপিয়ে হত্যা করেছে বলে শুনেছি। তবে এখন পর্যন্ত এ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কেউ থানায় অভিযোগ করেননি।’
পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে আরও একজন নিহত
বগুড়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘিরে গতকাল দিনভর বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে আরও একজন নিহত হয়েছেন। গতকাল রাতে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির বয়স আনুমানিক ৩০ বছর। এ নিয়ে সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে সাত হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার দুপুরের দিকে ছয়জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক আবদুল ওয়াদুদ।
অন্যদিকে গত রোববার দুপচাঁচিয়া উপজেলার কলেজছাত্র মনিরুল ইসলামের (২২) মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছেন দুপচাঁচিয়া উপজেলার বীরকেদার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সেলিম উদ্দিন। তিনি বলেন, সংঘর্ষে নিহত কলেজছাত্র মনিরুল ইসলামকে কাহালু উপজেলার বীরকেদার গ্রামে দাফন করা হয়েছে। তিনি বদলগাছী বঙ্গবন্ধু সরকারি ডিগ্রি কলেজের অর্থনীতি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন।
শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক আবদুল ওয়াদুদ বলেন, বগুড়া শহরে সহিংসতার ঘটনায় এই পর্যন্ত গুলিবিদ্ধ হয়ে ছয়জন মারা গেছেন। এর মধ্যে গতকাল সদর থানায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় মারা যাওয়া অজ্ঞাতনামা (৩০) ব্যক্তির পরিচয় পাওয়া যায়নি। অপর পাঁচজন হলেন বগুড়া সদরের আবদুল মান্নান সরকার (৬০), শহরের দক্ষিণ বৃন্দাবনপাড়া এলাকার শিমুল ওরফে মতি (৪৫), আকাশতারা এলাকার কমর উদ্দিন বাপ্পী (২৫), বগুড়া সদরের হরিগাড়ি এলাকার শিক্ষক সেলিম রেজা (৪৫) ও গাবতলীর গোড়দহ গ্রামের জিল্লুর রহমান (৩৫)। এরা গত রোববার পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে মারা যান।
শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক আরও বলেন, রোববার ও গতকাল দুই দিনে হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ ১৫০ জনকে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ হাসপাতাল থেকে চলে গেছেন।
কক্সবাজার থানা, হোটেল, বাসভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আগুনের ক্ষত

কক্সবাজার সদর মডেল থানায় গতকাল বিকালে হামলা ভাংচুর চালায় একদল লোক। এ সময় থানার আঙ্গিনায় রাখা জব্দ করা অর্ধশত মোটর সাইকেল লুট হয়।
কক্সবাজার শহরের সর্বত্র থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। গতকাল সোমবার বিকেলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবরে হাজারো ছাত্র-জনতা সড়কে নেমে এসে বিজয় উল্লাস করতে থাকেন। বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কক্সবাজার শহরের অভ্যন্তরে থানা, আওয়ামী লীগ নেতাদের বাসভবন, হোটেলসহ নানা স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
গতকাল বিক্ষুব্ধ লোকজন কক্সবাজার সদর মডেল থানা, ট্রাফিক পুলিশের কার্যালয়, শহরের লালদীঘির পাড়ে জেলা আওয়ামী লীগ, জেলা জাসদ, কিছুটা দূরে কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমলের মালিকানাধীন হোটেল নীদমহল, বিমান বন্দর সড়কে কক্সবাজার-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিকের মালিকানাধীন হোটেল সৈকত, বিমানবন্দর সড়কের নতুন বাহারছড়া এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা এ কে এম মোজান্মেল হকের বাসভবন ‘হক সন্স’, হলিডে মোড় এলাকার ট্যুরিস্ট পুলিশের অস্থায়ী কার্যালয় সিলভার সাইন, পাশের মুক্তিযোদ্ধা ভবন, মুক্তিযোদ্ধা চত্বরে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ভবন, সৈকত সড়কের হোটেল–মোটেল জোনের ইকরা বিচ রিসোর্ট, কলাতলী সড়কের ট্রাফিক পুলিশের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয় শতাধিক দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। কয়েকটি ব্যাংকে হামলা ও এটিএম বুথ ভেঙে টাকা লুটের চেষ্টা হয়েছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এসব ঘটনায় যাঁরা জড়িত ছিলেন, তাঁরা বেশির ভাগই মুখোশধারী শহরের বাইরের লোকজন। ছাত্র আন্দোলনের কেউ এ দলে নেই। শহরের বাইরে গতকাল রাতে মহেশখালীতে তিনজন আওয়ামী লীগ নেতার বাসভবনে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। ঈদগাঁও থানাতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। টেকনাফেও আওয়ামী লীগ কার্যালয় ও কক্সবাজার-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়া হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত পুরো শহর ঘুরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক মনে হলেও সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, হোটেল-রেস্তোরাঁর মালিক ও শ্রমজীবী মানুষের মনে চরম আতঙ্ক দেখা গেছে। তাঁরা পরিস্থিতি কোনো দিকে যাচ্ছে, তা ভেবে পাচ্ছেন না। সকাল থেকে শহরের প্রধান সড়ক, কলাতলী সৈকত সড়ক ও বাইপাস সড়কে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক (টমটম), অটোরিকশা চলাচল করতে দেখা গেলেও চট্টগ্রাম-ঢাকার পথে কোনো পরিবহন চলাচল করেনি। সব পরিবহনের টিকিট কাউন্টার বন্ধ। হামলা ও লুটপাটের আশঙ্কায় দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। কক্সবাজার সদর মডেল থানাসহ জেলার ৯টি থানার স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ আছে। থানার ফটকে তালা ঝুলছে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কেরা নানাভাবে চেষ্টা করেও হামলা ও লুটপাট বন্ধ করতে পারছেন না। গতকাল রাতে কক্সবাজার প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক রাকিব হাসান, শাহেদ বাবু, রবিউল আলমসহ কয়েকজন। তাঁরা বলেন, ‘শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবরে কক্সবাজারে আমরা শান্তিপূর্ণভাবে বিজয় উল্লাস করেছি। আমরা কোনো স্থাপনাতে হামলা করিনি। যাঁরা ভাঙচুর, হামলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছেন, তাঁরা তৃতীয় পক্ষের লোক। সমন্বয়কেরা জেলার কোথাও সরকারি–বেসরকারি ভবন কিংবা কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর না করার জন্য আন্দোলনরত ছাত্রদের অনুরোধ জানান।’
কক্সবাজার হোটেল–গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, দেশি-বিদেশি পর্যটকদের থাকার হোটেল–মোটেল জোনে হামলা আগুনের ঘটনা পর্যটনশিল্পে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটেছে। ছাত্র-জনতা বিজয় উল্লাস করছেন। কিন্তু কিছু মানুষের লুটপাট, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের ঘটনা সাধারণ মানুষকে হতাশ করছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এসব নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়বে। ইতিমধ্যে কোটা সংস্কার আন্দোলন ও কারফিউ পরিস্থিতির কারণে গত ১৩ দিনে কক্সবাজারের পর্যটনসহ ১৪টি খাতে ৯০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
সাতক্ষীরায় আওয়ামী লীগ নেতার ৫ স্বজনসহ নিহত ১৪
প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবরে সাতক্ষীরায় হামলা ও সহিংসতায় ১৪ জন নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপির দুজন আছেন। বাকিদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী। এ সময় একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
সাতক্ষীরা সদর ও শ্যামনগর থানা এবং ট্রাফিক কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন জেলার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কল্যাণপুর গ্রামের বাসিন্দা জাকির হোসেন, তাঁর ভাই জাহাঙ্গীর হোসেন, ভাইপো সজিব হোসেন, ভাগনে আশিকুর রহমান, স্বজন সাকের আলী ও গাড়িচালক শাহিন হোসেন।
এ ছাড়া আশাশুনি থানার কল্যাণপুর গ্রামের আদম আলী (২৮), কোলা গ্রামের আনাজ বিল্লাহ (১৭) ও কুড়িকাউনিয়া গ্রামের আনাজ আলী (১৮), সদর উপজেলার বৈকারি গ্রামের আওয়ামী লীগের কর্মী আসাফুর রহমান (৪০), মৃগাডাঙ্গা গ্রামের তৌহিদ ইসলাম (৩০), সাইফুল ইসলাম (২৫), বিএনপির কর্মী জাহিদ হোসেন (২৮) ও ফারুক হোসেন (৩৫) নিহত হয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতাপনগর ইউনিয়নের কয়েক হাজার লোক এক জোট হয়ে সন্ধ্যা ছয়টার দিকে আওয়ামী লীগ নেতা জাকির হোসেনের কল্যাণপুরের বাড়িতে হামলা করে। এ সময় জাকির বন্দুক দিয়ে গুলি করেন। গুলিতে ঘটনাস্থলেই আদম আলী, আনাজ বিল্লাহ ও আনাজ আলী (১৮) মারা যান। এরপর জাকিরের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় হামলাকারীরা। তারা রাত আটটার দিকে জাকিরসহ তার পাঁচ স্বজনকে পিটিয়ে হত্যা করে। প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু দাউদ বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
একইভাবে গতকাল রাতে সদর উপজেলার বৈকারি গ্রামের আওয়ামী লীগ কর্মী আসাফুর রহমানকে পিটিয়ে হত্যা করে। রাত নয়টার দিকে মৃগাডাঙ্গা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে মৃগাডাঙ্গা গ্রামের আওয়ামী লীগ কর্মী তৌহিদ ইসলাম, সাইফুল ইসলাম, বিএনপির কর্মী জাহিদ হোসেন (২৮) ও ফারুক হোসেন নিহত হন। বৈকারি ইউপির চেয়ারম্যান আবু মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গতকাল সন্ধ্যায় সাতক্ষীরা শহরে আওয়ামী লীগ নেতা আবু আহমেদ, ফিরোজ কামাল, লায়লা পারভিন, তামিম আহমেদ, সুব্রত ঘোষ, আবদুল মান্নান, তজুলপুরের সাংবাদিক ইয়ারব হোসেন, বৈকারি গ্রামের আলী হোসেন, নূরুল ইসলাম, ইউনুস আলী, আবু মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল, তালা উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা ঘোষ সনৎ কুমার, প্রণব ঘোষ, বিশ্বজিৎ সাধু, জাকির হোসেন, শেখ নূরুল হক, কলারোয়ার ফিরোজ আহমেদ, আমিনুল ইসলাম, মজনু চৌধুরী, কাজী শাহাদাত, শ্যামনগরের অসিম কুমার মৃধা, উৎপল মণ্ডল, মলয় মণ্ডল, আবদুল মুজিদ, রবিউল ইসলাম, এজাজ আহমেদ, সেলিনা সাঈদ, সেলিম রেজা, মতিয়ার রহমান, সুফিয়ান সফিকুল ইসলাম, আশাশুনির রাজেশ্বর দাস, পুলিশ কর্মকর্তা হারুন, দেবহাটার নজরুল ইসলামের বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কার্যালয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। তাঁদের কারও কারও বাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
এদিকে সাতক্ষীরা সদর থানা, ট্রাফিক কার্যালয় ও শ্যামনগর থানায় অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়েছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। একাধিক সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্যরা মুঠোফোনে তাঁদের আতঙ্কের কথা জানিয়েছেন। স্থানীয় থানাগুলোয় কোনো পুলিশ সদস্য না থাকায় তাঁরা কোথাও জানাতেও পারছেন না।
সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হুমায়ূন কবির প্রথম আলোকে বলেন, কয়েকটি বাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। পরিস্থিতির উন্নতির চেষ্টা চলছে। সবাইকে ঘরে ফিরে যেতে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে।
হিলিতে পৌর মেয়রের পুড়ে যাওয়া বাড়ি থেকে দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধার

পৌর মেয়র জামিল হোসেনের পুড়ে যাওয়া বাড়ি। আজ মঙ্গলবার দিনাজপুরের হাকিমপুরে।
দিনাজপুরের হাকিমপুরের হিলিতে পৌর মেয়র জামিল হোসেনের পুড়ে যাওয়া বাড়ি থেকে দুটি মরদেহ উদ্ধার করেছে হাকিমপুর ফায়ার সার্ভিস। নিহত ব্যক্তি হলেন হাকিমপুর উপজেলার বড় ডাঙাপাড়া গ্রামের মজনুর রহমানের ছেলে সূর্য রহমান (২০) ও জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলার বাগজানা ইউনিয়নের নাঈম হোসেন (২৩)।
নিহত দুজন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পৌর মেয়রের বাড়িতে আগুন লাগানোর সময় আটকা পড়েছিলেন বলে মনে করছেন স্থানীয় লোকজন।
হাকিমপুর ফায়ার সার্ভিসের টিম লিডার আবুল কাশেম প্রথম আলোকে বলেন, সোমবার সন্ধ্যায় পৌর মেয়রের বাড়িতে আগুন লাগার খবর পেয়ে হাকিমপুর ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিসের দলটি আগুন নেভানোর কাজ করে। রাত ১১টার দিকে ওই বাড়ির ভেতরে একটি গোসলখানায় দুজন যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ধারণা করা হচ্ছে, সোমবার বিকেলে আন্দোলনকারীরা যখন ওই বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেন, তখন হয়তো ওই দুজন বাড়িতে আটকা পড়েছিলেন। আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে বের হতে না পেরে সেখানে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে। দুজনের মরদেহ সাবেক পৌর মেয়র শাখাওয়াত হোসেনের উপস্থিতিতে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
রংপুরে আহমদিয়াদের উপাসনালয়ে আগুন, লুটপাট

রংপুরের তারাগঞ্জে গতকাল সোমবার রাতে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের উপাসনালয়ে হামলার ঘটনা ঘটে।
রংপুরের তারাগঞ্জে গতকাল সোমবার রাত আটটার দিকে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের উপাসনালয় ভাঙচুর করা হয়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে সেখানে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। প্রাচীর ভেঙে ইটও খুলে নেয় হামলাকারীরা।
গতকাল প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও তাঁর দেশ ছাড়ার খবরে আনন্দমিছিল বের হয়। সেখান থেকে নানা স্থানে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়। গতকাল সন্ধ্যা ছয়টার দিকে উপজেলা পরিষদের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো ভাঙচুর করা হয়। এ সময় পরিষদ চত্বরের ভেতরে থাকা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ভাঙচুর করা হয়। এরপর উপজেলা পরিষদের পাশে থাকা মুক্তিযোদ্ধা ভবনে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙচুর করা হয়।
রাত ১১টার দিকে তারাগঞ্জ চৌপথী এলাকায় অবস্থিত উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আতিয়ার রহমানের রাসায়নিক সারের গোডাউনে হামলা চালানো হয়। এ সময় হামলাকারীরা গোডাউনে থাকা ৪৬০ বস্তা সার লুটপাট করে নিয়ে যায় বলে তিনি জানিয়েছেন।
তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুবেল রানা বলেন, উপজেলা পরিষদে লাগানো সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো ও বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ভাঙচুর করা হয়েছে। এ ছাড়া মুক্তিযোদ্ধা ভবনে, আহমদিয়া সম্প্রদায়ের উপাসনালয় ও আওয়ামী লীগ নেতার ব্যবসায়িক গোডাউনে হামলা ও লুটপাটের খবর তিনি পেয়েছেন।
পুলিশ নেই, জয়পুরহাট থানা পাহারা দিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা

জয়পুরহাট সদর থানার প্রধান ফটক। আজ মঙ্গলবার দুপুরে তোলা:
জয়পুরহাট সদর থানায় হামলা চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এ সময় গুলিতে মেহেদী নামের একজন ঘটনাস্থলে নিহত হয়েছেন। সেনাবাহিনীর সদস্যরা এসে থানায় অবরুদ্ধ থাকা পুলিশ সদস্যদের নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে গেছেন।
সোমবার রাতে এসব ঘটনার পর আজ মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত থানায় কোনো পুলিশ সদস্যকে দেখা যায়নি। ছাত্ররা থানা পাহারা দিচ্ছেন। আজ মঙ্গলবার এসপির কার্যালয়ে কোনো পুলিশ সদস্যদের দেখা যায়নি।
এর আগে সোমবার বিকেলে জয়পুরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য ও হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপনের শহরের শান্তিনগর বাসায় হামলা চালিয়ে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার আবু সাঈদের বাসা থেকে জিনিসপত্র খুলে নিয়ে যেতে দেখা গেছে। সোমবার বিকেলে এসপি কার্যালয়, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আরিফুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেনসহ আওয়ামী লীগের ১০-১২ জন নেতার বাসায় হামলা-ভাঙচুর করা হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে জয়পুরহাট পৌরসভায় হামলার চেষ্টা করা হয়। তবে ছাত্রদল নেতা আদনান তাঁদের সরিয়ে নিয়ে যান। আজ শহরের কোথাও পুলিশ দেখা যায়নি। তবে সেনাবাহিনীকে শহরে টহল দিতে দেখা গেছে।
মঙ্গলবার দুপুরে জয়পুরহাট সদর থানায় দেখা গেছে, থানার পূর্ব দিকের প্রাচীর ভাঙা রয়েছে। থানায় মূল ফটক ভেতর থেকে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। থানার চত্বরে ভেতরের ফটকে ১০-১২ জন শিক্ষার্থী পাহারা দিচ্ছিলেন। উৎসুক লোকজন ভাঙা প্রাচীর সামনে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। শিক্ষার্থীরা সাংবাদিকদের ছবি তুলতে দেননি।
থানার সামনের কয়েকজন দোকানি বলেন, সোমবার রাতে লোকজন থানায় হামলা করে। এ সময় পুলিশ সদস্যরা ছাদে উঠে জোর করে হামলাকারীদের কাছে ক্ষমা চেয়েও রক্ষা পাননি। সেনাবাহিনীর সদস্যরা থানায় এসে ভাঙা প্রাচীর দিয়ে পুলিশ সদস্যদের বাইরে নিয়ে গেছেন। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে শহরের নতুন হাট মহল্লার মেহেদী নামের এক যুবকের ঘটনাস্থলে মৃত্যু হয়।
উত্তেজিত জনতা থানার ভেতর ঢুকে আগুন দিয়েছেন। এরপর থেকে থানা অরক্ষিত ছিল। আজ মঙ্গলবার ১০টার পর শিক্ষার্থীরা এসে থানা পাহারা দিচ্ছেন। জেলা সদর ছাড়া অন্য চারটি উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন স্থানে সোমবার বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বাড়ি-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের খবর পাওয়া গেছে।


























